Slideshow


রাহুল সিনহা'র মহাভারত  মহাসাগর ৫

মহাকাব্যে উপেক্ষিত

তাঁর জন্মের পর পিতামহী বলেছিলেন, "বৎস, তুমি  কুরুকুলে জন্মেছ, তুমি সাক্ষাৎ ভীমের তুল্য এবং পঞ্চপাণ্ডবের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তুমি আমাদের সাহায্য করো।" পঞ্চপাণ্ডবের প্রয়োজনের সময়ে তাঁকে সর্বদাই আমরা উপস্থিত থাকতে দেখেছি। তাঁর ভয়াবহ যুদ্ধকৌশল কর্ণের মতো বীরকেও বিচলিত করেছে, বাধ্য করেছে  নিজের অস্ত্রাগারের  সবচেয়ে ঘাতক আয়ুধ প্রয়োগ করতে। যার ফলে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন অর্জুন।  কিন্তু বংশের জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে  সিংহাসনের ন্যায্য উত্তরাধিকার তো নয়ই, এমনকি যে উপযুক্ত  সমাদরটুকু পাবার কথা, তাও  তিনি কখনও পেলেন না।  তাঁর জননী মহারাজ  পাণ্ডুর বংশের প্রথম পুত্রবধূ হিসেবে  কখনও হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে পা রেখেছেন, এমন কোনো উল্লেখ মহাভারতের কবি দেননি।  বরং  তাঁর বীরোচিত মৃত্যুর পর কৃষ্ণকে উল্লাস করতে দেখা গেলো। এই অরণ্যবাসী অনার্য মানুষটি মহাকাব্যে চির উপেক্ষিতই থেকে গেলেন। 



 বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়, আমি ঘটোৎকচের কথা বলছি। মা রাক্ষসী হিড়িম্বা। বাবা মধ্যম পাণ্ডব ভীম।  গঙ্গার দক্ষিণ পাড়ের অরণ্য প্রদেশের অধিপতি রাক্ষস হিড়িম্ব তাঁর মামা। বারণাবতের লাক্ষাগৃহের আগুন থেকে রক্ষা পেয়ে পাণ্ডবরা নৌকায় গঙ্গা পার হয়ে দক্ষিণদিকে গেলেন।  বনে জঙ্গলে ঘুরতে লাগলেন।  একরাতে যত দূরেই যান সেটা আর্যাবর্তের বাইরে নয়। আমাদের অনুমান, উত্তরাপথের শহর ও গ্রামে আর্য বসতির বিস্তার ততদিনে হলেও বনাঞ্চলে এই দেশের আদিম মানুষদের প্রভাব তখনও ক্ষীণ হয়নি। তারা রাক্ষস, দৈত্য, দানব নন। বরং বনবাসী অনার্য মানুষ। বেদের সময় থেকে বহিরাগত আর্যরা এদের মনুষ্যেতর জ্ঞানেই রাক্ষস, অসুর এসব নামে আলাদা করে চিহ্নিত করেছেন।

বনের গভীরে শালগাছের ওপর হিড়িম্বর আবাস। তার মানে সম্ভবত এরা বৃক্ষমানব। গাছের ওপর তৈরি বাড়িতে  থাকেন।  সেখানে বসেই হিড়িম্ব কুন্তী ও তাঁর পাঁচ ছেলেকে দেখতে পান। মহাভারতে হিড়িম্ব তার বোন হিড়িম্বাকে এদের বধ করে খাবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন বলে যে বিবরণ আছে, তা কতটা সত্যি, কতটা অনার্যদের সম্পর্কে আর্যদের কপোলকল্পিত প্রচার সেটা বলা কঠিন।  তবে মহাভারতে হিড়িম্বের মুখে এটুকু উল্লেখ অবশ্যই আছে যে তুমি শিগগির গিয়ে জেনে এসো এরা কে। এরা আমার অধিকারে (আমার অধিকৃত এলাকায়) নিদ্রিত আছে। আমাদের মতে এটা ঠিক।  নিজের এলাকায় অপরিচিত কিছু লোকজন দেখলে খোঁজখবর নেওয়াই স্বাভাবিক।  হিড়িম্ব সেই খবর বৃত্তান্ত নেবার জন্যেই নিজের বোন হিড়িম্বাকে পাঠিয়েছেন।  হিড়িম্বা যে এদের সন্ধান নিতে এসে ভীমের প্রেমে পড়লেন এবং ভাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন সেটা সবারই জানা।  কিন্তু এই গল্পে হিড়িম্বার যে বর্ণনা মহাভারতের কবি দিয়েছেন,  ভাইকে ছেড়ে মধ্যম পাণ্ডবকে বরণ করার যে কারণ দেখালেন তাতে কোনো রাক্ষসী বা দানবীর নয়, অতি সাধারণ এক মেয়ের মনোভাব স্পষ্ট হয়।


দলত্যাগ করার জন্য হিড়িম্বার মনে যেসব কারণ দেখিয়েছেন ব্যাস,  তাতে কামবাসনা যেমন আছে সেই সঙ্গে একইরকম জোরালোভাবে আছে একটি অনূঢ়া মেয়ের বাপ ভাইয়ের ঘর ছেড়ে নিজের  স্বামীর ঘর করার চিরাচরিত ইচ্ছে।  তাই ব্যাস লিখেছেন, "পতিস্নেহোতিবলবান্ তথা ন ভ্রাতৃসৌহৃদম।" আর্য রমণী নয় বলেই তার মনোগত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশও স্বকীয় এবং আদিম।  আর এই নারী মনের ঘর বাঁধার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থেকেই হিড়িম্বার সোদর ভাইয়ের সঙ্গ ছেড়ে ভীমের কাছে আত্মনিবেদন। এর মধ্যে যদি শুদ্ধবাদীরা হিড়িম্বার রাক্ষস স্বভাব,  বেহায়া কামবাসনার দাসত্ব দেখে তার নিন্দেমন্দ করেন, তবে আমরা বলবো, এই অসংকোচে নিজের মনের কথা স্পষ্ট করে বলতে পারাটা নির্লজ্জতা বা রাক্ষসীয় নয়। বরং এটাই অনার্য,  এদেশের আদিম জনজাতির মানুষের বিশেষত মেয়েদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তাদের সমাজের মেয়েরা আর্যসভ্যতার মেয়েদের চেয়ে অনেক স্বাধীন।  নিজের পছন্দের স্বামী নির্বাচনের অধিকার তাদের বরাবরই ছিলো।  হিড়িম্বা সেই অধিকারেরই প্রয়োগ করেছেন মাত্র।  ঠিক  এই নিয়মেই ভীম আর হিড়িম্বার হাত ধরে কুরুবংশে ফের বর্ণসংকর হলো, অসবর্ণ বিবাহ হলো, ঘটোৎকচের জন্ম হলো।  ফের কথাটা বলার কারণ,  এরও আগে পাণ্ডবদের পূর্বপুরুষ যযাতি দানবরাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠাকে গান্ধর্ব বিবাহ করেছেন।  আর শর্মিষ্ঠার কনিষ্ঠ পুত্র পুরুরই বংশধর আজকের পাণ্ডবরা।


এই পর্যন্ত দেখলে বিষয়টা খুব অস্বাভাবিক নয়।  আর্য পুরুষ ভীমকে অনার্যা হিড়িম্বার ভালো লেগেছে,  তাঁরা বিয়ে করেছেন। তাঁদের সন্তানও জন্মেছে। কুন্তীর কথায় ঘটোৎকচকে পাণ্ডবদের প্রথম সন্তান এবং হিড়িম্বাকে সেই সূত্রে পরিবারের প্রথম বধূ হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমরা এখনো আদিপর্বে রয়েছি। সভাপর্ব থেকে দ্রোণপর্ব অবধি ঘটোৎকচের জীবনকাল। এই বিরাট কালপর্বে প্রথম পাণ্ডবসন্তানের উল্লেখ খুব একটা মিলবে না। আদিপর্বে জন্মের পর ভীমপুত্রের সম্পর্কে আমরা শুধু এটুকুই মহাভারতের কবির কাছে শুনতে পাচ্ছি,  জন্মের পর হিড়িম্বা ঘটোৎকচকে নিয়ে কুন্তী ও পাণ্ডবদের সামনে উপস্থিত করেছেন।  কুন্তীও নিজের জ্যেষ্ঠ পৌত্রকে যথাবিহিত আশীর্বাদ করে বলেছেন, "ত্বং কুরূণাং কুলে জাতো সাক্ষাদভীমসমো হ্যসি। জ্যেষ্ঠঃ পুত্রোহসি পঞ্চানাম...।"  একই নিঃশ্বাসে এই পৌত্রটিকে বলেছেন, প্রয়োজনে তুমি আমাদের সাহায্য করো। এই সম্বোধনে কুন্তী, আমরা বলবো, ঘটোৎকচ ও তার মাকে কুরুকুলের সন্তান ও বধূ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন।  কিন্তু তাঁদের পরিবারের সর্বসময়ের সদস্য হিসেবে সঙ্গে থাকতে বললেন না। বরং প্রয়োজনের সময় সাহায্য করতে বলে তার অধিকার এবং কর্তব্যের সীমা চিহ্নিত করে দিলেন।  আমরা বলবো ঘটোৎকচ এই সীমানা ছাড়াননি কখনও।  বরং বংশের প্রথম সন্তান হিসেবে নিজের রাক্ষস পরম্পরায় গর্ব বজায় রেখে বলেছেন,  রাক্ষস রাবণনন্দন ইন্দ্রজিতের মতোই আমি পিতার মতো বলশালী। সুতরাং যখনই দরকার পড়বে আমি পিতার কাছে উপস্থিত হবো (কৃত্যকাল উপস্থাস্যৈ পিতৃনিতি ঘটোৎকচঃ)। এরপর মহাভারতের কবি আমাদের জানিয়েছেন হিড়িম্বা তাঁর ছেলেকে নিয়ে আরও উত্তরের দিকে চলে গেছেন।


এই যে হিড়িম্বা ও তার ছেলে পাণ্ডবদের ছেড়ে নিজেদের অরণ্য-পর্বতের আশ্রয়ে ফিরে গেলেন, তারপর মহাভারতের দীর্ঘ পথচলাতে আমরা তাদের আর দেখা পাইনি, যতক্ষণ পাণ্ডবদের ঘটোৎকচকে প্রয়োজন পড়েনি। এরপর অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রৌপদীর বরমাল্য পেয়েছেন। পাঁচ ভাইয়ের সঙ্গে  দ্রৌপদীর বিয়ে হয়েছে।  পাণ্ডবরা শ্বশুরকূল এবং যাদবকূলের সম্মিলিত শক্তির সহায়তায় পৈতৃক রাজ্যের অর্ধেকটা পেয়েছেন। খাণ্ডবপস্থের বনভূমি জ্বালিয়ে নতুন রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ তৈরি করেছেন। ময়দানব ইন্দ্রের সভার চেয়েও রমণীয় ও অত্যাশ্চর্য সভা নির্মাণ করে দিয়েছেন।  এরপর গোটা জম্বুদ্বীপের চক্রবর্তী সম্রাট হবার বাসনায় যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছেন। তাতে গোটা ভারতের রাজসমাজ, ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শূদ্র সবাই যে যার যুগোপযোগী মর্যাদা অনুযায়ী আমন্ত্রণ পেয়েছেন।  কুরুকুলের সব প্রধান পুরুষরা, যদুকুলের সব দিকপাল বীরেরা আমন্ত্রিত। শুধু আমন্ত্রণ পাননি মহারাজ পাণ্ডুর প্রথম পুত্রবধূ হিড়িম্বা আর পাণ্ডবদের সর্বজ্যেষ্ঠ পুত্র ঘটোৎকচ। অন্তত পেয়েছেন বলে কবি ব্যাস আমাদের জানাননি। পেলে রাজসূয় যজ্ঞের বিশাল আয়োজনের কোথাও আমরা নিশ্চয় ঘটোৎকচ এবং তাঁর জননী হিড়িম্বাকে দেখতে পেতাম।  যদি আমন্ত্রিত হতেন, আর্যদের রাজসভায়  কেমন সমাদর পেতেন এই অনার্য বীর ও তাঁর জননী? ব্যাস বলেননি। কিন্তু ব্যাসের অনেক পরের এক অনার্য কবি বাংলার পয়ার ছন্দে লেখা নিজের কাশীদাসী মহাভারতে তার একটা বিবরণ দিয়েছেন।

হিড়িম্বা দেখিয়া চমকিত অন্তপুরী।/ রূপেতে নিন্দিত যত স্বর্গ বিদ্যাধরী।।

অলঙ্কারে বিভূষিত অনিন্দিত অংগ।/ বিনামেঘে স্থির যেন তড়িত তরঙ্গ।।

কুন্তীর চরণে গিয়া প্রণাম করিল।/ আশীর্বাদ করি কুন্তী বসিতে বলিল।।

যথায় দ্রৌপদী ভদ্রা রত্ন সিংহাসনে।/ হিড়িম্বা বসিল গিয়া তার মধ্যস্থানে।।

অহঙ্কারে দ্রৌপদীরে সম্ভাষ না কৈল।/ দেখিয়া পার্ষতী দেবী অন্তরে কুপিল।।

এই যে বর্ণনাটুকু আমরা পেলাম, তাতে আমরা মনে করি হিড়িম্বা নিজের উচিত কাজই করেছেন। তিনি  ইন্দ্রপ্রস্থে না থাকলেও পাণ্ডবদের পরিবারের প্রথম বধূ। দ্রৌপদীরই কি তাঁকে এগিয়ে এসে সম্মান ও সমাদর জানানো উচিত ছিলো না? বিশেষ করে হিড়িম্বা যখন প্রথমবার এই পুরীতে পা রেখেছেন? কিন্তু সেটা হয়নি।  তার পরে দেখছি আর্যা সম্ভ্রান্ত নারী দ্রৌপদী যে ভাষায় হিড়িম্বাকে আক্রমণ করেছেন  তা কি আদৌ সভ্যজনোচিত? দ্রৌপদী বলছেন,

পূর্বে শুনিয়াছি আমি তোর বিবরণ।/ তোর সহোদরে ভীম করিল নিধন।।

 ভ্রাতৃবৈরী জনে কেহ না দেখে নয়নে।/ কেমনেতে ভজিলি হেনজনে।।

 সতত ভ্রমিস তুই যথা লয় মন।/ একে কুপ্রকৃতি আর নাহিক বারণ।।

স্থানে স্থানে বেড়াস ভ্রমরে যেন মধু।/ সভামধ্যে বসিলি হইয়া কুলবধূ।।

মর্যাদা থাকিতে কেন না যাস উঠিয়া।/ আপন সদৃশ স্থানে তুমি বস গিয়া।।

মূল মহাভারতে এই বিবরণ নেই। তবে কাশীরাম দাসের এই বিবরণ আসলে অনার্যদের প্রতি উদ্ধত আর্যদের মনোভাবেরই প্রতিফলন। যেমনটা আমরা রামায়ণে শম্বুক কিংবা মহাভারতেই একলব্যের সঙ্গে হতে দেখেছি।  সেদিক থেকে ব্যাস যে ঘটোৎকচ এবং হিড়িম্বাকে পাণ্ডবদের রাজসভায় নিয়ে যাননি সেটা হয়তো এমন কোনো ঘটনার সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই।

এরপরে আমরা আর হিড়িম্বাকে দেখিনি। ঘটোৎকচকে যুদ্ধের আগে শুধু একবারই বনপর্বে দেখা গেছে।  টেলিভিশনের সিরিয়ালে  ভীম ও ঘটোৎকচের সাক্ষাতের যে চমৎকার গল্পটি আমাদের অনেকেই বহুবার দেখে মুগ্ধ হয়েছি, তার উৎস মূল মহাভারত নয় । বরং সপ্তম শতকের কবি ভাসের লেখা নাটক  মধ্যমব্যায়োগ।  মূল মহাভারতে  পথশ্রমে ক্লান্ত পাঁচ পাণ্ডব ভাই আর দ্রৌপদীকে কাঁধে চাপিয়ে ঘটোৎকচ ও তার সহচররা বদরিকাশ্রমে নিয়ে গেছেন। এর চেয়ে বেশি সময় মহাকাব্যের মহাকবি তাঁর জন্য খরচ করেননি।


এবার চলুন কুরুক্ষেত্রের চতুর্দশ দিনের গভীর রাতের যুদ্ধে। জয়দ্রথ নিধনের পরে ক্রুদ্ধ কৌরব শিবির সূর্যাস্তের পরেও যুদ্ধ জারি রাখতে চাইছে। কর্ণ  কালান্তক যুদ্ধ করছেন। এই সময়ে অর্জুন আর কর্ণের সম্মুখ সমর হলে জন্মজাত কবচ কুণ্ডলের বিনিময়ে ইন্দ্রের থেকে পাওয়া এবং অর্জুনের জন্যই সযত্নে রক্ষিত একাঘ্নী প্রয়োগ করতে পারেন রাধেয়। আর তাকে প্রতিহত করার মতো কোনো আয়ুধ অর্জুনের তূণীরেও নেই। এই সময়েই ঘটোৎকচের কথা মনে পড়েছে  কৃষ্ণের। রাজশেখর বসুর মহাভারত সারানুবাদে আছে,   অর্জুন যখন কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করার কথা বলছেন তখন  কৃষ্ণ বলছেন, তুমি অথবা রাক্ষস ঘটোৎকচ ভিন্ন আর কেউ কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারবে না। এখন তাঁর সঙ্গে তোমার যুদ্ধ করা আমি উচিত মনে করি না, কারণ তাঁর কাছে ইন্দ্রদত্ত শক্তি অস্ত্র আছে, তোমাকে মারবার জন্য কর্ণ এই ভয়ংকর অস্ত্র সর্বদা সঙ্গে রাখেন। অতএব ঘটোৎকচই তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করুক।

পরের গল্পে ঘটোৎকচ অসহনীয় বীরত্ব দেখিয়ে যুদ্ধ করেছেন।  দুর্যোধনের হয়ে যুদ্ধ করতে আসা রাক্ষস অলায়ুধের মাথা কেটেছেন। অসংখ্য কৌরব সৈন্য বধ করেছেন। কর্ণের রথের চারটি ঘোড়াকে একটি অস্ত্রে মেরে ফেলেছেন। কর্ণ বাধ্য হয়েছেন অর্জুন বধের জন্য বহুকাল যত্নে রক্ষিত ইন্দ্রের দেওয়া  অমোঘ একাঘ্নী অস্ত্র ঘটোৎকচের দিকে নিক্ষেপ করতে।  মৃত্যুর আগেও নিজের শরীরকে বিশালাকৃতি করে মাটিতে পড়া শবের নিচে আরও বহু শত্রু সৈন্যকে চাপা দিয়ে যুদ্ধ শেষ করেছেন তিনি। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে গেছেন তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনকে। তাঁর প্রয়াণে পাণ্ডবরা শোকার্ত হয়েছেন। অথচ কৃষ্ণ হৃষ্ট হয়ে সিংহনাদ করেছেন। রথের ওপর নেচেছেন, তাল ঠুকে ঠুকে গর্জন করেছেন। এতে অর্জুন অপ্রীত হলে জবাবে বলেছেন, এই রাক্ষস ব্রাহ্মণদ্বেষী, যজ্ঞদ্বেষী ধর্মনাশক পাপাত্মা, সেজন্যই কৌশলে তাকে নিপাতিত করিয়েছি, ইন্দ্রের শক্তিও ব্যয়িত করিয়েছি। আমিই কর্ণকে বিমোহিত করেছিলাম, তাই তিনি তোমার জন্য রক্ষিত শক্তি ঘটোৎকচের উপর নিক্ষেপ করেছেন। 

বাস্তবে পঞ্চপাণ্ডব ছাড়া ঘটোৎকচের মৃত্যুতে কাঊকে শোকার্ত হতে দেখা যায়নি। অভিমন্যুর মৃত্যুর পর অর্জুন জয়দ্রথ বধের কঠিন শপথ নিয়েছিলেন,  তার অনেক পরে  দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্রের মৃত্যুর জন্য অশ্বত্থামাকে শাস্তি দিতে  কৃষ্ণ সহ পাণ্ডবরা মহর্ষি ব্যাসের আশ্রম অবধি ছুটে গেছেন। কিন্তু ঘটোৎকচের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে আসতে কাউকে দেখা যায়নি। বরং যুদ্ধে অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করে মৃত্যুর পরেও কৃষ্ণ তাঁর নামে ব্রাহ্মণদ্বেষী, যজ্ঞদ্বেষী ধর্মনাশক বলে কালিমা লেপন করেছেন।  অনার্য ঘটোৎকচ তাই কেবলই ব্যবহৃত হয়েছেন, ব্যবহারের পরে অনাদৃত আর উপেক্ষিতই থেকে গেছেন ব্যাসের মহাকাব্যে।

চলবে...

No comments:

Post a Comment