Slideshow


প্রবন্ধ

রবীন্দ্রনাথের ছবি: অবচেতনের রাজপথ

ড. অর্পিতা আচার্য

সুরিরিয়্যালিজম মুভমেন্ট এর মূল উপজীব্য ছিল ফ্রয়েডিয়ান মনঃসমীক্ষণের আলোতে অবচেতনের অন্ধকারকে খুঁজে দেখা, শিল্পীর শৈল্পিক কাজগুলিকে অবলম্বন করে। স্বতস্ফুর্ত সৃজনকে স্বপ্নের মতোই অমূর্ত এবং 'রয়্যাল রোড অফ আনকনশাস' ধরে নিয়ে, তার ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেছেন তারা। সুরিরিয়্যালিজমের  পথিকৃৎ আন্দ্রে ব্রেটন মনে করতেন, চিত্রশিল্পের মাধ্যমে অমূর্ততাকে খোঁজার প্রচেষ্টা  শিল্পীমনকে আধুনিক সমাজের সহস্র বন্ধন ও জটিলতা থেকে মুক্ত করবে। অর্থাৎ শিল্প একদিকে যেমন স্রষ্টার মুক্তির উপায়, তাঁর অবচেতন মনের জটের ক্যাথার্সিস, অন্যদিকে শিল্পীমনকে অন্বেষণ করার উপায়ও । 

 

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ছবিগুলি নিয়ে আধুনিক সময়ে যেন নতুন করে এক অন্বেষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে । কবির অন্তর্লোককে জানতে তাঁর লেখার চাইতেও তাঁর আঁকা ছবি যেন সহায়তা করে বেশি। লেখার ক্ষেত্রে কবি সংহত, চেতন নিয়ন্ত্রণে গণ্ডিবদ্ধ, কবির রয়েছে নিজস্ব ইমেজ, রয়েছে চাওয়া-পাওয়ার অজস্র হিসাব-নিকাশ, রয়েছে সমাজানুগ বহিঃপ্রকাশের দায়বদ্ধতা । কিন্তু ছবি তাঁর একান্ত নিজস্ব জগৎ । সেখানে কারো প্রবেশাধিকার নেই। নেই প্রকাশের তাড়া বা চাহিদা। নেই প্রশংসা নিন্দার কষ্টিপাথর। আর এই কারনেই কবির আবেগীয় বিমোচনের জায়গাও তার ছবিই।

কবির কাছে ছবি আঁকা ছিল এক দুর্দমনীয় টান। ছবি আঁকতে বসার আগে তিনি জানতেন না, কি আঁকবেন। কলম, তুলি, কাগজ আর মন তাকে এগিয়ে নিয়ে যেত ক্রমশ এক সম্পূর্ণতার দিকে। এই বন্ধনহীন টানেই সাধারণত খুব সকালবেলার দিকে সরঞ্জাম নিয়ে বসে পড়তেন তিনি। বিভিন্ন রঙ, পেন্সিল, ব্রাশ টেবিলে ছড়ানো থাকতো। পেন্সিলের প্রথম টানে আউটলাইন ফুটে উঠত। তারপর লেয়ারের পর লেয়ার দিয়ে রঙ চাপাতেন ছবিতে। এমনকি আঙ্গুল রঙে ডুবিয়ে সেই ছবির উপর প্রয়োজনে বুলোতেন তিনি।  যেন এক দৈবীশক্তি ভর করত তখন তার ওপর । শিশুর মতো রঙ তুলি নিয়ে খেলায় মত্ত হয়ে উঠতেন। এ সময় যেন জগৎবিচ্ছিন্ন, সামাজিক সত্তার খোলস থেকে বাইরে, শুধু ব্যক্তিগত এক জগতে মুহ্যমান সত্তা তিনি। তখন এই অজানা ছবি, যার শেষ রূপ নিজেও তখনও তিনি জানেন না, সেই ছবিটির অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে রেখেছে তাঁকে, সেই ছবিই টেনে নিয়ে যাচ্ছে তার নিজের পথে। 

 

 চিত্রকলার এই ধরণটিকে 'পারফরমেটিভ আর্ট' বলা হয়, কারণ এখানে কোনো কিছুই আগের থেকে স্থিরীকৃত নয়। সমস্তটাই অ্যাক্সিডেন্টাল। স্ট্রিম অফ কনশাসনেস এর অবিরত প্রবাহকে প্রবহমান অবস্থায় ধরে রাখা, লেখায় যা ব্যবহার করেছেন বহু বিখ্যাত সাহিত্যিকরা, তা কবির এই শিল্পী সত্তায় ফুটে উঠেছিল। এখানে সম্পূর্ণভাবেই আনএডিটেড চিন্তা যেমনভাবে সে বহমান  ঠিক তেমনভাবে ধরার চেষ্টা হয়েছে, সচেতন চিন্তার কোনো রকম বাধা বন্ধনহীনতা ছাড়া। অমিয় চক্রবর্তীর প্রভাবে একবার কবি চেতনা প্রবাহের অপরিশীলিত রূপটিকে ধরে লেখার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও পরে পাগলামি মনে করে তা ত্যাগ করেন। ছবির ক্ষেত্রে এই পাগলামিকে তিনি প্রশ্রয় দিয়েছিলেন, কারণ এখানে নিজের কাছে ছাড়া কারও কাছে দায়বদ্ধতা নেই তাঁর। এ জন্যেই হয়তো এসব ছবি হয়ে উঠেছে তাঁর অবচেতনের রাজপথ।

 

 রবীন্দ্রনাথের ছবির জগৎ বিষাদমাখা। বেশিরভাগ ছবিতে ডার্ক রং ব্যবহার করেছেন তিনি। ছায়াময়, রহস্যমাখা আবহে আঁকা ছবিতে মানুষের মুখ পাথরের মত ভাবলেশহীন। চোখ স্থির ও মৃত। ছবি আঁকতে গেলেই তাঁর  নতুন বৌঠানের কথা মনে পড়ে, এমন মন্তব্য করেছিলেন কোনো একসময় কবি। সমালোচক পার্থ মিটার কবির এই ছবি গুলিকে তার অবচেতন বিষাদের ক্যাথার্সিস বলে ব্যাখ্যা করেছেন । বিষন্নতা, উদ্বেগ, সমালোচনা, দুঃখ, মৃত্যু ও বিচ্ছেদ কবির জীবনকে বারবার অস্থির করেছে। সেই অস্থিরতা থেকে মুক্তির উপায় হিসাবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ছবিকে। ১৯৩০ সালে লেখা চিঠিতে ইন্দিরা দেবীকে তিনি বলেছিলেন, ছুটির দিনগুলিতে, যখন তাঁর ব্যস্ততা থাকবে না, কলম ব্যবহার করবেন না তিনি... শুধু বসে থাকবেন এক কোণে, আর মন ভরে ছবি আঁকবেন । প্রতিমা দেবীকে লেখা এক চিঠিতেও একইরকমভাবে বলেছিলেন, ছুটি পেলে ছবি আঁকাই তাঁর একমাত্র প্যাশন। রানী চন্দের লেখা বইয়ে কবির ইচ্ছার কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে কবি বলেছেন আর কোনো বাসনা নেই তার... শুধু ইচ্ছা সব কাজ সরিয়ে রেখে যদি আঁকা যায় ছবির পর ছবি!

 

 রবীন্দ্রনাথের ছবি আসলে তাঁর মানসিক মুক্তির কাহিনী। তাঁর মুক্ত-ইচ্ছার দলিল । আপাত সংযত, ইমেজের ঘেরাটোপে বন্দী এই মানুষটির রক্ত মাংসের মনের খোঁজে ও মনোবিশ্লেষণে ভবিষ্যতে হয়তো এরাই হয়ে উঠবে মূল চাবিকাঠি।

No comments:

Post a Comment