Slideshow


প্রবন্ধ

 রবীন্দ্রনাথ এবং বৈষ্ণব সাহিত্যঃ একটি পর্যালোচনা

ইমরান হাসান (বাংলাদেশ)

বীন্দ্রনাথ তার সঞ্চয়িতার ভুমিকা লেখার সময় উল্লেখ করেছিলেন “ আমার অল্প বয়সেই জ্যাঠামো রোগ হইয়া গিয়াছিল , বাংলা সাহিত্যের বড় বড় প্রায় সকল বইই আমার তখন পাঠ করা শেষ” এহেন পাঠক রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে, কোন একক সাহিত্য কর্ম অধিক সংখ্যক মর্যাদা লাভ করাটা প্রায় অসম্ভব। তবে এর মাঝেও একটি সাহিত্যকর্ম কবিগুরুর জীবনে সবথেকে অধিক পরিমানে প্রভাব বিস্তার করে এসেছে প্রথম জীবন এবং পরবর্তী জীবনে। গবেষকদের মতে রবীন্দ্রনাথের বৈষ্ণব পদাবলির ভাষা বিশেষরূপে প্রিয় ছিল এবং রবীন্দ্রনাথের কেন্দ্রীয় দর্শন, সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় এর সাথে সাথে তার যে আধ্যাত্নিক প্রেমের বিষয়ে এক অজানা আকর্ষণ কাজ করত সেই আকর্ষণ এর মুল তিনি লাভ করেছিলেন বৈষ্ণব পদাবলি থেকে।

এই কারণেই সম্ভবত উনি রচনা করেন ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি, বৈষ্ণব পদাবলির অনুকরণে, তার এই কাব্যের মাঝের ভাষা ছিল বিদ্যাপতির আবিষ্কৃত ভাষা ‘ব্রজবুলি’ যে ভাষাতে বৈষ্ণব পদাবলি রচিত হয়েছিল। 

এই কাব্যের মাঝে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন মধ্যযুগের কবিকণ্ঠহার বিদ্যাপতির এক অজানা অধ্যায়, এমনকি কেউ কেউ তার এই পদাবলিকে বৈষ্ণব পদাবলির হারিয়ে যাওয়া অংশ বলেও মনে করেছিল। 

তার প্রথম কবিতা গ্রন্থ ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি’ এর মাঝের প্রথম কবিতার প্রথম চরন এই বিষয়েই সাক্ষ্য দেয়। 

বসন্ত আওল রে!

মধুকর গুন গুন, অমুয়ামঞ্জরী

কানন ছাওল রে।

শুন শুন সজনী হৃদয় প্রাণ মম

হরখে আকুল ভেল,

জর জর রিঝসে দুখ জ্বালা সব

দূর দূর চলি গেল।


মরমে বহই বসন্ত সমীরণ,

মরমে ফূটই ফুল,

মরম কুঞ্জপর বোলই কুহু কুহু

অহরহ কোকিল কুল। 

রবীন্দ্রনাথ নিজের সর্বপ্রথম যে সাহিত্য সমালোচনা প্রদান করেছিলেন, ভুবনমোহিনী প্রতিভা, অবসর, সরোজিনী এবং দুঃখ সঙ্গিনী এই নামে এবং সেই কাব্যসাহিত্য সমালোচনা প্রকাশিত হয়, জ্ঞানাঙ্কুর এবং প্রতিবিম্ব পত্রিকাতে। সে সমালোচনার মাঝেও রবীন্দ্রনাথকে আমরা খুজে পাই আমরা পাই তার গভিত অন্তর্দৃষ্টিকে, তিনি উল্লেখ করেন কেমন ভাবে বৈষ্ণবগণের এই সকল কাব্যের মাঝের অসাম্প্রদায়িক অন্ত্যজ বাণী বাংলার মাঝে ধর্ম বিস্তারে কিরূপ ভূমিকা রেখেছে। 

তার মতে বাংলার মাঝে কৃষ্ণনাম ও শ্রীকৃষ্ণের কীর্তনের ফলেই হিন্দুধর্মের পুনঃ জাগরণ সম্ভবপর হয়েছিল, এবং এর পিছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে বৈষ্ণবগণ। তাঁর নিজের ভাষ্যমতেই এই গীতিকাব্যই চৈতন্য ধর্মকে বাংলার মাটিতে বদ্ধমূল করিয়া গিয়াছে, জয়দেব, বিদ্যাপতি প্রমুখ কবিগণের লেখনি হইতে প্রেমের অশ্রু নির্গত হইয়া বঙ্গদেশ প্লাবিত করেছে।  

রবীন্দ্র রচনাবলীর মাঝে বিদ্যাপতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয় অনেক ক্ষেত্রেই, এছাড়াও বাউল ও বৈষ্ণব দের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় অনেক ক্ষেত্রেই বাউলদের ক্ষেত্রে মাধুরিভাব বা মাধুর্যের  যে সার্বজনীন প্রেম এর দেখা বাউলরা পেতে চায়, এবং এই কারণে প্রেমে পাগল বা ‘বাউল’ তারা নাম লাভ করে। সেই প্রেম রবীন্দ্রনাথকেও অনেক ক্ষেত্রেই স্পর্শ করেছে। 

এক্ষেত্রে গবেষকগণ উল্লেখ করেন যে 

ব্রজবুলি কৃত্রিম ভাষা ও এর সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথ এর এই কাব্য বা পদাবলির মাঝে বৈষ্ণব পদাবলির প্রাণ গলানো সুর না থাকলেও সমসাময়িক বহু রবীন্দ্রনাথের কাব্যের অপেক্ষা ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি’ অনেক উন্নতমানের। এছাড়াও গবেষকগণের মতে রবীন্দ্রনাথ ব্রজবুলি ভাষার সর্বশেষ কবি। 

এ বিষয়ে  রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কুমার পাল তাঁর রবিজীবন গ্রন্থের পাদটিকাতে চন্দ্রনাথ বসুর নিম্নলিখিত উক্তিটি  বর্ণনা করেন যে 

The sentiment of love is expressed in these sonnets   in forms which are at once so deep, delicate, tine, fervid and in verses so full of the luxuriance of Music and melody that it is  difficult  to  decide  who  the  better  sonneteer  the  imitator Bhanusinha Thakur is, or his Model the great Baisnaba poet. 

রবীন্দ্রনাথের  প্রথমদিকের কাব্যের মাঝে আমরা দেখতে সক্ষম হই, এক অসীম প্রেমের প্রতি আহ্বান এই আহ্বান তাঁর রচিত পরবর্তী কাব্যের মাঝেও আমরা লাভ করি, রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলীর মাঝে তিনি উল্লেখ করেন 

সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর—

আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।

কত বর্ণে কত গন্ধে  কত গানে কত ছন্দে

অরূপ, তোমার রূপের লীলায় ভাগে হৃদয়পুর।

আমার মধ্যে তোমার শোভা এমন সুমধুর।

তোমায় আমায় মিলন হলে সকলই যায় খুলে,

বিশ্বসাগর ঢেউ খেলায়ে উঠে তখন দুলে।

তোমার আলোয় নাই তো ছায়া,  আমার মাঝে পায় সে কায়া,

হয় সে আমার অশ্রুজলে সুন্দরবিধুর।

আমার মধ্যে তোমার শোভা এমন সুমধুর। 

এই যে জীরাত্নার সহিত পরমাত্নার মিলন এটি বৈষ্ণব সাহিত্যের মাঝে প্রধান কথা, ধারণা করা হয়ে থাকে যে শ্রী-চৈতন্য তাঁর অন্তিম সময়কালের পুর্বে রাধা বর্ন বসন ধারন করে স্বয়ংকে কৃষ্ণের নিকট সমর্পণ করেছিলেন। স্বয়ংকে এই যে ভুলে গিয়ে পরমাত্নার সহিত জিবাত্নার মিলন, এই কাব্য রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে ভিন্ন ভাবে রচনা করলেও তাঁর মূল প্রথিত ছিল বৈষ্ণব সাহিত্য এবং কৃষ্ণপ্রেমের মাঝে। এই কাব্যময়তা এবং প্রেম যে রবীন্দ্রনাথ এক মুহূর্তের জন্য পরিত্যাগ করতে সক্ষম হননি, সেটি পরবর্তীকালে বিভিন্ন রবীন্দ্র গবেষক তাদের লেখাতে উল্লেখ করেছেন, যে বাউল ও বৈষ্ণব ধারাকে সর্ব সাধারণের মাঝে নিয়ে আসার জনক হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ এই বিষয়ে বিশ্বনাথ রায়  বলেন

“পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের দেহ মনে প্রত্যক্ষ অপ্রত্যক্ষ যে ভাবেই হোক না কেন বৈষ্ণব পদাবলীর ভাষা ,ভাব সুর ছন্দ রূপকল্প নানা প্রকরণে মিশে যেতে পেরেছে, আজীবন শুধু সচেতন মনেই নয়, অবচেতনভাবেও বৈষ্ণব ভাবুকতাকে এক মুহূর্তের জন্য পরিহার করতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ।“  

১২৯২ সালে পদরত্নাবলী প্রকাশের মাধ্যমে সেই বিষয়ে আরও অধিক অগ্রসরতার প্রমাণ দেন রবীন্দ্রনাথ । রবীন্দ্রনাথ নিজেই উল্লেখ করেছিলেন তাঁর রচনাবলির মাঝে যে 

“Fortunately for me a collection of old lyrical poems composed by the poets of the

Vaishnava sect came to my hand when I was young. I became aware of some underlying idea deep in the obvious meaning of these love poems. ….The Vaishnava poet sings of the Lover who has his flute which, with its different stops, gives out the varied notes of beauty and love that are in Nature and Man”. 

প্রকৃতি ও পুরুষের মাঝের মিলনকে সাংখ্য দারা আমরা ব্যাখা করতে পারি এটিই বাংলার সর্বপ্রাচীন দর্শন,তবে এর মাঝে প্রেমের লালিত্য যিনি এনে দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ভালোবাসার মাধ্যমেই তিনি পেতে প্রচেষ্টা করেছেন সেই অচেনা পরমাত্নাকে যাকে আমরা সব সময়েই লাভ করতে চেয়েছি আমাদের মাঝে। তিনি তাঁর উক্তি সমূহের মাঝে তাঁর মথুরায় কবিতার মাঝেও উল্লেখ করেছেন সেই কৃষ্ণপ্রেমকে। তাঁর এই আধ্যাত্নিক বিরহ আমরা দেখতে পাই নিম্নলিখিত ছত্রের মধ্যে। 

হৃদয়ে বিরহ - জ্বালা , এ নিশি পোহায় , হায় ।

কবি যে হল আকুল , এ কি রে বিধির ভুল ,

মথুরায় কেন ফুল ফুটেছে আজি লো সই ?

বাঁশরি বাজাতে গিয়ে বাঁশরি বাজিল কই ? 

আধ্যাত্নিক ও তুরীয় প্রেমকে পুঁজি করেই রবীন্দ্রনাথ এর কবিতা সামনে এগিয়ে গেছে, তবে এই ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের মাঝে ভাস্বর। তাঁর প্রতিটি কাব্য তাঁর রচনার মাঝে আমরা দেখতে পাই বৈষ্ণব ভিত্তির পরেও তাঁর নিজস্ব দর্শন, যা তিনি সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের মাঝে উল্লেখ করে গিয়েছিলেন। 

দেশশূন্য কালশূন্য জ্যোতিঃশূন্য, মহাশূন্য-'পরি

           চতুর্মুখ করিছেন ধ্যান,

মহা অন্ধ অন্ধকার সভয়ে রয়েছে দাঁড়াইয়া--

           কবে দেব খুলিবে নয়ান।

অনন্ত হৃদয়-মাঝে আসন্ন জগৎ-চরাচর

           দাঁড়াইয়া স্তম্ভিত নিশ্চল,

অনন্ত হৃদয়ে তাঁর ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান

           ধীরে ধীরে বিকাশিছে দল।

এই কাব্য যা প্রভাত সঙ্গীতে তিনি রচনা করেছিলেন, সেই কাব্যের মাঝে থেকেই বিকশিত হয়েছে রবীন্দ্র দর্শন, এবং সেই দর্শনের মাঝের প্রলেপ হচ্ছে, বৈষ্ণব সাহিত্য যা এই সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়কে বেঁধেছে প্রেমের সুত্রে।

এই কারনেই আমরা বৈষ্ণব পদাবলির প্রবহমান ধারা হতে লাভ করতে পারি রবীন্দ্র সাহিত্যের এক বিশাল সমুদ্রকে, রবীন্দ্রনাথের মাঝে তাঁর ছোটগল্প হতে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের বাংলার এই বৈষ্ণব পদাবলি ও কৃষ্ণপ্রেমের ছাপ দেখে যেতে পারি, রবীন্দ্র নাথ তাঁর রচনার মাঝে, শেখর পুণ্ডরীকের দন্দ্বের ক্ষেত্রেও যেন এক বৈষ্ণব সাহিত্যের দ্বন্দ্বের ছাপ রেখে যান যেন, দুইজনের মাঝে প্রতিযোগিতা চলছে কৃষ্ণ ও কৃষ্ণ প্রেম কি তা নিয়ে । এর সাথে সাথে তাঁর গীতি তাঁর সঙ্গীতের মাঝেও আমরা দেখতে পাই কৃষ্ণ ভাবনা ও কৃষ্ণপ্রেম, তাঁর রচনার মাঝে হিন্দুত্ব এবং কৃষ্ণপ্রেম ছিল নিত্য অনুষঙ্গ, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টপাধ্যায় রচিত কৃষ্ণভাবনার সমালোচনার মাঝেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন এই প্রেমের অভাব বিষয়কে, রবীন্দ্রনাথ আমাদের মাঝের সেই সুদূর সাংখ্য হয়ে শাক্ত থেকে বৈষ্ণব ধারাকে একক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবীতে এক আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছেন।

No comments:

Post a Comment