রাহুল সিনহা'র মহাভারত- মহাসাগর
পর্ব:এক
কৈফিয়ৎ ও কবুলনামা
খুব ছোটোবেলায় শিশু সাহিত্য সংসদের রঙিন ছবি দেওয়া বইতেই সম্ভবত প্রথম পড়া। যেমনটা আমার বয়সী অনেকেই পড়েছেন। আরেকটু বড় হয়ে যোগীন্দ্রনাথ সরকার, তারপর উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছেলেদের মহাভারত সেই সঙ্গেই তাঁরই লেখা মহাভারতের গল্প। পাণ্ডব - কৌরব ঝগড়া বিবাদের বাইরেও যে মহাভারতজুড়ে হাজারো গল্প ছড়িয়ে আছে, সেটা সেই প্রথম জানা। প্রায় সেই সময়েই বোধহয় মামারবাড়িতে প্রথম পড়া কাশীরাম দাসের মহাভারত। আরেকটু বড় হয়ে রাজশেখর বসুর লেখা মহাভারতের সারানুবাদ। এরপর নানাভাবে, নানা জনের লেখায় মহাভারত নিয়ে যত রকম ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ চোখে পড়েছে, পড়েছি, যা পেয়েছি সংগ্রহ করেছি।
মহাভারত সংক্রান্ত কিছু পেলেই আমি পড়তে থাকি, সেসব নিয়ে ভাবারও চেষ্টা করি। রামায়ণও পড়েছি। রামায়ণ বা মহাভারত আমার চোখে এবং আরও অনেকেরই চোখে ধর্মগ্রন্থ নয়,বরং মহাকাব্য। কিন্তু সাহিত্য হিসেবে নিশ্চয়ই অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে মহাভারতের উৎকর্ষ, গভীরতা ও ব্যাপ্তি রামায়ণের চেয়ে বহুগুণে বেশি। আর তার মূল কারণ, অন্তত আমার মতে মহাভারতের চরিত্রগুলি। ব্যাসের আঁঁকা চরিত্রগুলোকে মনে হয় রক্ত মাংসের। কাহিনীর প্রয়োজনে কিংবা সমসাময়িক ধর্মীয় বিশ্বাসের নিরিখে তাদের ওপর কোথাও দেবত্ব বা অলৌকিকতার হস্তাবলেপ ঘটলেও তাদের আচার আচরণ অনেকটাই দোষ গুণে ভরা মানুষের মতো। তাদের ব্যবহার, নানা পরিস্থিতিতে তাদের প্রতিক্রিয়ায় রাগ, ক্রোধ, লোভ, ভয়, অনুশোচনা, ভালোবাসা, স্নেহ, ঘৃণা, বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা, মহানুভবতা সহ মানব চরিত্রের সবরকম আলো অন্ধকারেরই ছায়া পড়েছে। যেমন আমরা আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত দেখি। ঠিক এই কারণেই মহাভারত আমার বরাবরের খুব প্রিয় বইগুলোর তালিকায় থেকে গেছে।
এর একটা কারণ মহাভারতের কবি। যে কাহিনীতে তিনি নিজে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে, যে যুদ্ধে তার নিজেরই পৌত্র, প্রপৌত্ররা পরস্পরের বিরুদ্ধে আত্মবিনাশী সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে, সেই কাহিনী এতটা নিস্পৃহ ও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে লেখা যায়, এটাই ভাবতে অবাক লাগে। আবার দেখুন, মহাভারতের কবি নিজে ব্রাহ্মণ ঋষি পিতা এবং ধীবরকন্যা মাতার সন্তান। অর্থাৎ তিনি নিজেই বর্ণসংকরের উদাহরণ। অথচ মহাভারতের কোথাও কোথাও বিশেষ করে গীতায় বর্ণসংকরের তীব্র বিরোধিতা আছে। তাতে এটাই কি স্পষ্ট হয়ে ওঠে না, যে মূল মহাভারতের সঙ্গে সময়ে সময়ে নিজের যুগ বৈশিষ্ট্য ও ভাবনা অনুযায়ী অন্য অনেকে নিজের লেখা মিশিয়ে দিয়েছেন? যদিও মহাভারতের কবির কবিখ্যাতি এতটাই ব্যাপক ও বিশাল যে সেসব পরবর্তী কবিরা নিজেকে অপ্রকাশিত রেখে ব্যাস নামের সমুদ্রেই নিজেকে বিলীন করে কৃতার্থ হয়েছেন।
এতসব ভূমিকা করার আসল উদ্দেশ্য পাঠক নিশ্চয় এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন। হ্যাঁ। মহাভারতকে নিজের মতো করে দেখার, ভাবার, বোঝার এবং বিশ্লেষণ করার ইচ্ছে থেকেই এই লেখা। নিঃসন্দেহে এ এক বিরাট ধৃষ্টতা। না কোনো আধ্যাত্মিক ভক্তিজনিত বিনয় থেকে একথা বলছি না। বলছি এই জন্যে যে মহাভারতের মূল সংস্কৃত পাঠ আমি পড়িনি, কারণ সংস্কৃতে আমার বিদ্যা ক্লাস এইট অবধি। দ্বিতীয়ত, মহাভারত নিয়ে এর আগে এতজন পণ্ডিত এত কথা লিখে ফেলেছেন যে আমার জন্য বলার মতো বা লেখার মতো আছে কি না, সেটাও একটা ভাবার বিষয়। তবু কুঁঁজোরও তো চিৎ হয়ে শোবার সাধ হয়!
নাহ! এই লেখা কোনো পাণ্ডিত্য প্রকাশের চেষ্টা নয়। শুধুই একজন বস্তুবাদীর চোখ দিয়ে কয়েক হাজার বছর আগে হয়তো কয়েকশো বছর ধরে অনেকের হাতে লেখা একটি মহাকাব্যকে নিজের মতো করে বোঝার চেষ্টা।
এই কাজটা আমার চোখে জরুরি। শুধু এইজন্যে নয় যে মহাভারত একটি অসাধারণ সাহিত্যকৃতি। মহাভারতে যেমন বলা হয়েছে,
" ধর্মে চার্থে চ কামে চ মোক্ষে চ ভরতর্ষভ
যদি হাস্তি তদন্যত্র যন্নোহাস্তি ন কুত্রচিৎ"
মানে ধর্মশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র, কামশাস্ত্র বা মুক্তির শাস্ত্র যা এই মহাভারতে আছে, তা অন্যত্রও আছে ; আর যা এখানে নেই তা আর কোথাও নেই, এই দাবিও আমি মানি না। কারণ মহাভারতের পরেও সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি অর্থনীতি, সহ নানা বিষয়ে অসংখ্য নতুন লেখা হয়েছে যা নতুন নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
তবে এটাও ভাবার এবং অবাক হবার মতো যে মানব মনের প্রায় সব রকম ভাবনা, সে আলোকিতই হোক, বা অন্ধকারময়, সেসবের ছায়া নিশ্চিতভাবে এই মহাকাব্যের কোনো না কোনো চরিত্রের কোনো না কোনো সময়ের কাজে বা ভাবনায় ফুটে উঠেছে। সুতরাং ধর্ম, অর্থ, কাম বা মুক্তি বিষয়ে মহাভারতের কবির দাবির সঙ্গে একমত না হলেও মানব চরিত্র সম্পর্কে সেই দাবি মেনে নিতে কোনো অসুবিধে হয় না।
রাজশেখর বসু এ বিষয়ে খুব সুন্দর করে বলেছেন, " সৌভাগ্যের বিষয়, অতিপ্রাচীন ইতিহাস ও রূপকথার সংযোগে উৎপন্ন এই পরিবেশে আমরা যে নরনারীর সাক্ষাৎ পাই তাদের দোষগুণ সুখদুঃখ আমাদেরই সমান। মহাভারতের যা মুখ্য অংশ, কুরুপাণ্ডবীয় আখ্যান, তার মনোহারিতা অপ্রাকৃত ব্যাপারের চাপে নষ্ট হয়নি। স্বাভাবিক মানব চরিত্রের ঘাতপ্রতিঘাত, নাটকীয় ঘটনা সংস্থান, সরলতা ও চক্রান্ত, করুণা নিষ্ঠুরতা,ক্ষমা ও প্রতিহিংসা, মহত্ত্ব ও নীচতা, নিষ্কাম কর্ম ও ভোগের আকাঙ্ক্ষা, সবই প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। আজকাল যাকে 'মনস্তত্ত্ব' বলা হয়, অর্থাৎ গল্পবর্ণিত নরনারীর আচরণের আকস্মিকতা ও জটিল প্রণয়ব্যাপার, তারও অভাব নেই। অতি প্রাচীন ব্যাস ঋষি যে কোনও অর্বাচীন গল্পকারকে এই বিদ্যায় পরাস্ত করতে পারেন।"
তাই মানুষের ভাবনা, তার বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিক্রিয়া এসব বোঝার ক্ষেত্রে, মহাভারত একটি চমৎকার দলিল হতে পারে। যারা মানুষকে নিয়ে কাজ করেন, ( তার মধ্যে রাজনীতিও পড়ে)তাদের জন্য মানুষের তথা গণ মানুষের মনোভাব, কোনো ঘটনা বা পদক্ষেপে তাদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে মহাভারত একটা জরুরি সাহায্যকারী রেফারেন্স হতে পারে।
সেসব ভাবনা থেকেই এই লেখার ইচ্ছে। লেখাটা কতদূর এগোবে, আর কোথায় থেমে যাবে সেটা এই মুহূর্তে আমারও জানা নেই। প্রতি মাসে বা একটা নির্দিষ্ট সময়ান্তরেই যে লেখাটার পরের পর্ব উপস্থিত করতে পারবো, এমন প্রতিশ্রুতি পাঠককে তো নয়ই, এমনকি নিজেকেও দিতে পারছি না। বরং বলা যাক, প্রয়োজনীয় বইপত্র যেমন যেমন এবং যখন হাতের কাছে পাবো এবং নিজের জ্ঞান বুদ্ধি অনুযায়ী সেসব পড়ে নিজের মতো করে বুঝতে এবং লিখতে পারবো তখন এবং তেমন করেই এই লেখাও এগোতে থাকবে।
যারা এ লেখা পড়বেন, তারা নিজগুণেই তা পড়বেন। আমার মতের সঙ্গে সবাই যে সবসময় একমত হবেন সে আশাও রাখছি না। এটা আমার, এবং একেবারেই একান্তভাবে আমার নিজস্ব মহাভারত দর্শন। যারা সঙ্গে যেতে চান তারা নিজের চোখ, কান এবং মন খোলা রেখেই সঙ্গে আসবেন, ভাববেন। যদি কোথাও ভাবনার বা দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য দেখা দেয়, সেটা বলতে কোনো বাধা নেই। যদি যুক্তি দিয়ে বিচার করে সেই বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারি তবে আমার ভাবনার প্রয়োজনীয় সংশোধন করতেও অরাজি নই। তবে শেষ বিচারে এই লেখা যেহেতু আমার, তাই আপনার/ আপনাদের মতকে সম্মান জানিয়েও ভিন্ন মত পোষণ করার অধিকারটুকু বজায় রাখতে চাইবো।

khub bhalo suchona
ReplyDelete