Slideshow


মহাভারত মহাসাগর

 রাহুল সিনহা'র মহাভারত- মহাসাগর 

পর্ব:দুই

মহাকাব্যের কবি

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন,  "কবি ছাড়া জয় বৃথা" । সে লেখা অন্য তাৎপর্যে। কিন্তু মহাভারতের কবিকে বাদ দিয়ে সত্যিই 'জয়' বৃথা। বিদগ্ধ পাঠক জানেন মহাভারতের আদি আখ্যানের নাম 'জয়'।  পরে তা আরও কলেবরে বেড়ে আজকের মহাভারত হয়েছে। কিন্তু আদি তথা মূল পাঠ কুরু রাজবংশের দুই শাখার সংঘর্ষের বৃত্তান্ত।  সেই আখ্যানের নাম 'জয়'। আর সেই কাব্য সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে তার কবির কথাও একই নিঃশ্বাসে আসবে। কারণ কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস শুধুই মহাভারতের কবি নন। সেই কাব্যের নানা ঘটনার তিনি অংশীদারও বটে।  অথচ কাব্যের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়েও তিনি যেন অংশ নন। অনেকটা fellow traveller।  ইংরেজিতে clinical detachment বলে একটা কথা আছে।  ব্যাসের নির্লিপ্তি ঠিক সেরকম নয়। তিনি কবির মর্মবেদনা নিয়েই সব কিছু দেখছেন। হয়তো কোথাও কোনো ঘটনায় তিনি অংশীদার। কিন্তু প্রায় কখনওই সেই ঘটনাপ্রবাহকে কোনো বিশেষ খাতে বইয়ে দিতে সচেতন প্রয়াসও নিচ্ছেন না তিনি।


এসব কথা পরে আসবে।  আপাতত এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া যাক, কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস নামের মানুষটিই কি মহাভারতের রচয়িতা? ইতিহাস থেকে এই প্রশ্নের জবাব বা প্রমাণ পাওয়া কঠিন। কারণ রামায়ণ বা মহাভারত ইতিহাস নয়। বরং মহাকাব্য।  তবে তাতে সমসাময়িক সমাজ জীবনের ছবি নিশ্চয়ই আছে।


ভারততত্ত্ববিদ সুকুমারী ভট্টাচার্য লিখেছেন, পণ্ডিতদের মতে মহাভারতের রচনাকাল খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ  শতক থেকে খ্রিষ্টীয়  চতুর্থ শতক, এই আটশো বছরের মধ্যে। আর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ (যদি তা আদৌ হয়ে থাকে)  হয়েছে  খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতকে। (মহাকাব্য মহাভারত, পৃষ্ঠা ২৮৯, প্রবন্ধ সংগ্রহ।। ১।। সুকুমারী ভট্টাচার্য।)



সুতরাং ব্যাস যদি মহাভারতের যুগের মানুষ হয়ে থাকেন, তবে  সেই যুদ্ধ হবার ৫০০ বছর পর তাঁর পক্ষে লেখা কতটা সম্ভব?


এখানে ব্যাসের নামটি নিয়ে আমাদের একটু ভাবনা চিন্তা করতে হবে। তাঁর গায়ের রঙ কালো তাই নাম কৃষ্ণ। বাবা ঋষি পরাশর, মা ধীবরকন্যা সত্যবতী।  জন্ম যমুনা নদীর কোনো এক বদ্বীপে। তাই তিনি দ্বৈপায়ন। আর ব্যাস তাঁর উপাধি। বেদ বিভাজন করেছেন, তাই তিনি ব্যাস। এ নামের অর্থ কী? বিষ্ণুপুরাণে মোট ২৮জন ব্যাসের উল্লেখ আছে।  এদের মধ্যে আছে বাল্মিকীর নামও।


বেদ বিভাজন কী? আর্যরা যখন বেদ রচনা করেন তখন তা লিখিত রূপে ছিলো না। সমস্ত বেদই ছিলো মুখে মুখে রচিত ও কণ্ঠস্থ। যে কারণে বেদকে শ্রুতিও বলা হয়।  পরবর্তী সময়ে বেদের শ্লোকগুলো লিপিবদ্ধ  হয়েছে।  সেগুলো বিষয় অনুযায়ী সাজানো হয়েছে।  আধুনিক ভাষায় একে আমরা সম্পাদনা ও সংকলন (Editing and compilation)  বলতে পারি। এই কাজ হয়তো কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের আগে আরও ২৭জন করেছেন। কিন্তু তাঁর হাতে এসে এই কাজ সম্পূর্ণ ও সুচারু হলো। ফলে ব্যাস উপাধিটি তাঁর নামের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেলো যে পূর্ববর্তী ২৭ জনের নাম কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের  খ্যাতির আড়ালে চাপা পড়ে গেলো।  এটা অবশ্য নতুন কিছু না।  আধুনিক যুগের দিকে তাকান।  কলকাতার সংস্কৃত কলেজ থেকে 'বিদ্যাসাগর' উপাধি অনেকেই পেয়েছেন। কিন্তু  ঈশ্বরচন্দ্রের প্রসিদ্ধি এতটাই বেশি যে বিদ্যাসাগর বলতে আমাদের বীরসিংহের ওই করুণাসাগরের নামই মনে আসে।


যাই হোক,  ব্যাস বেদকে চার ভাগে ভাগ করলেন। সেটা নিজের চার শিষ্য পৈল, জৈমিনি,  সুমন্ত ও বৈশম্পায়নকে শেখালেন।  একজন মানুষের জীবনে এত বড় একটা কাজ করার পর কি আজ আমরা যে বিশাল মহাভারত দেখি তা লেখা  সম্ভব?  তিনি যে মহাভারত লিখেছেন, তা কি আজকের মহাকাব্য মহাভারত?  নাকি কুরু পাণ্ডবদের যুদ্ধের প্রথম বিবরণ, যার নাম "জয়"?


এ কথা বলার কারণ মহাভারতের কাহিনি "জয় থেকে অনেকটাই বিবর্ধিত হয়ে ভারত কাব্য হয়েছে। তারপর তা মহাভারত হয়েছে। এই বিস্তৃতি হয়েছে সময়ের সঙ্গে।  "জয়" মূল ক্ষত্রিয়কাহিনি। তারপর এতে সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দয়া, ক্ষমা, অহিংসা, সত্যনিষ্ঠার মতো মানবিক গুণাবলীর প্রশস্তিসূচক বিভিন্ন কাহিনি। তখন তার নাম  "ভারত"।  কিন্তু এরও পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেবতার মহিমাকীর্তন,  তীর্থমাহাত্ম্য, বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার সমর্থন,  জন্মান্তরবাদ, কর্মফলের হিসেব-নিকেশ সর্বোপরি ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন। এই তৃতীয় সংযোজনের অনেকটাই ভৃগুবংশীয় উগ্র ব্রাহ্মণদের হাতে। যেজন্য এই পরবর্তী সংযোজনের অনেকটাকেই পণ্ডিতদের বৃহদাংশ "ভার্গব প্রক্ষেপ" বলে থাকেন।


মূল ক্ষত্রিয় কাহিনি জয় মাত্র ২৪ হাজার শ্লোকে রচিত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংযোজনে যার অনেকটাই গুপ্তযুগের সূচনার দুয়েক শতাব্দীর মধ্যে হয়েছে,  আজকের মহাভারত এক লক্ষ শ্লোকের এই  বিশাল রূপ পেয়েছে।


এই বক্তব্যের সমর্থন খোদ মহাভারতের কথকের মুখেই মিলবে। মহাভারতের একেবারে গোড়ায় দেখুন।  এই কাহিনি আমরা প্রথম শুনতে পাচ্ছি নৈমিষারণ্যে ( এখনকার লখনৌর লাগোয়া নিমসর?)। সেখানে ১২ বছর ধরে যজ্ঞ করছেন কুলপতি আচার্য শৌনক ( আজকের দিনের তুলনায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর)।  সেখানেই মহাভারতের আখ্যান শোনাতে এসেছেন কথক সৌতি উগ্রশ্রবা। তিনি এবং তাঁর বাবা সূত লোমহর্ষণ   ব্যাসের চার শিষ্যের অন্যতম বৈশম্পায়নের মুখে  এই  কাহিনি শুনেছেন জনমেজয়ের সর্পসত্রে। বৈশম্পায়ন বর্ণিত সেই কাহিনিই তিনি শোনাতে এসেছেন কুলপতি শৌনকের আশ্রমে। তিনি সেখানে স্পষ্টই বলছেন,  " কয়েকজন কবি এই ইতিহাস পূর্বে বলে গেছেন, এখন অপর কবিরা বলছেন,  আবার ভবিষ্যতে অন্য কবিরাও বলবেন। ব্যাসদেব এই মহাভারত সংক্ষেপে বলেছেন আবার সবিস্তারেও বলেছেন।  কোনো কোনো ব্রাহ্মণ এই গ্রন্থ আদি থেকে, কেউ আস্তীকের উপাখ্যান থেকে, কেউ বা উপরিচরের উপাখ্যান থেকে পাঠ করেন।" (মহাভারত, সারানুবাদ, রাজশেখর বসু)।  একথার  একটা সহজ অর্থ হলো মহাভারতের  মূল কবির পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথক মহাভারতের কাহিনি  বলেছেন। স্বাভাবিকভাবে মহাভারতের মূল আখ্যান অপরিবর্তিত রেখেও তার সঙ্গে  সেই সব কবির নিজস্ব ভাবনা অনুযায়ী নতুন নতুন শাখা প্রশাখা, কাহিনি,  উপকাহিনি যুক্ত হয়েছে।  সেসবের সঙ্গে সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাবলী, এবং যিনি তা সংযোজন করছেন তার নিজস্ব  রাজনৈতিক দর্শনেরও প্রভাব পড়ছে।


উদাহরণ হিসেবে আদিপর্বে উতঙ্ক, পৌষ্য ও তক্ষকের কাহিনির কথা ভাবুন।  উতঙ্ক গুরুদক্ষিণা দেবেন।  গুরুপত্নী দক্ষিণা হিসেবে চাইলেন  রাজা পৌষ্যের রানির কানের কুণ্ডলজোড়া। রানির কাছ থেকে তা নিয়ে উতঙ্ক যখন ফিরবেন, তখন রাজা সতর্ক করে দিলেন, কুণ্ডলজোড়ার ওপর নাগরাজ তক্ষকের লোভ আছে।  উতঙ্ক চলতে চলতে দেখলেন এক নগ্ন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী (ক্ষপণক)  তাঁঁকে অনুসরণ করছে। পথে কোথাও উতঙ্ক একটি পুকুরের পাড়ে কুণ্ডলজোড়া রেখে স্নান করতে গেলেন।  ক্ষপণকরূপী তক্ষক সেই সুযোগে কুণ্ডল চুরি করে পালালো।


এই কাহিনি থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না,   যখন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের বিবাদ বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে, তখন এই কাহিনি মহাভারতের পরবর্তী কবিরা সংযোজন করছেন।  উদ্দেশ্য, জনপ্রিয় এই কাহিনির মাধ্যমে  বৌদ্ধদের চোর, লোভী বলে প্রচার করে জনমনে তাদের খাটো করা।


কিন্তু মজার বিষয় হলো,  মহাভারতে নানা সময়ে নানা কাহিনি,  উপকাহিনি যুক্ত হলেও সংযোজনকারীরা সেসবের কৃতিত্ব নিতে চাননি। বরং ব্যাসের নামের সমুদ্রে নিজের নাম বিলীন করেই কৃতার্থতা ও চরিতার্থতা বোধ করেছেন। সমস্ত পরবর্তী সংযোজনের সঙ্গেই সমগ্র রচনাকে ব্যাসপ্রোক্ত বলে চালিয়েছেন। যে জন্য আজও কোনো কথকতার আসরে মহাভারতের কথক যে আসনটিতে বসে এ কাহিনি শোনান, সেই আসনটিকে সসম্মানে ব্যাসাসন বলা হয়।


যার লেখা নিয়ে এত কথা,  সেই কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস আসলে কেমন?  তিনিই যদি আজকের বিশাল মহাভারতের একমাত্র রচয়িতা তাহলে তাঁঁর রচনায় ও জীবনে এত অসামঞ্জস্য কেন?


মহাভারতের শান্তিপর্বে এবং গীতাতে বর্ণসংকরের প্রবল বিরোধিতা করা হয়েছে।  অথচ ব্যাস তো নিজেই ব্রাহ্মণ পিতা ও ধীবরকন্যা  (শূদ্রা)  মাতার সন্তান। আবার ভাবুন,  বিচিত্রবীর্যের আকস্মিক মৃত্যুর পর সত্যবতী এবং ভীষ্ম পরামর্শ করে ব্যাসকে ডেকে আনলেন অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য।  সেই হিসেবে ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডু দুজনেই ব্যাসের সন্তান।  কিন্তু  এদের কাউকেই নিজের আত্মজ বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন না মহাভারতের কবি।  বরং সেই স্বীকৃতি দিচ্ছেন শূদ্রা দাসীর গর্ভজাত বিদূরকে। বলছেন "....  বিদূরো নাম কৃষ্ণ দ্বৈপায়নাত্মজঃ"।


আরো দেখুন,  আমরা জানতাম সত্যযুগে শুধু ব্রাহ্মণের বেদে অধিকার,  ত্রেতা যুগে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের, দ্বাপরে বৈশ্যদের জন্য বেদের দরজা উন্মুক্ত হলো। কিন্তু শূদ্রের সে অধিকার নেই।  বরং রামায়ণের যুগে শম্বুক বেদাধ্যয়ন ও তপস্যা করেছিলো বলে রাম তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। অথচ ব্যাস তার বেদ বিভাজনের কাজ শেষ করে, চার শিষ্য এবং পুত্র শুকদেবকে তা শিখিয়ে বলছেন,  " ভবন্তো বহুলাঃ সন্তু বেদো বিস্তার্য্যতাময়ম্। " তোমরা ৫ জনেই বহু হও। তোমাদের শিষ্য প্রশিষ্যদের মাধ্যমে বেদ বিস্তার লাভ করুক।  শুধু তাই নয়, ব্যাস চতুর্বণের জন্যই বেদ উন্মুক্ত করে দিচ্ছেন।  যুগধর্ম অনুযায়ী ব্রাহ্মণকে অগ্রবর্তী আসনে বসার অধিকার দিয়েও বলছেন,  বেশ, ব্রাহ্মণরা সামনের আসনে বসুন,  কিন্তু বেদ চতুর্বর্ণকেই শোনাও, "শ্রাবয়েচ্চতুরো বর্ণান্ কৃত্বা ব্রাহ্মণমগ্রতঃ"।  আর মহাভারত,  যাকে পঞ্চম বেদও বলা হয়, তা সবার আগে কাহিনি হিসেবে যার মুখে আমরা শুনতে পাচ্ছি সেই সৌতি উগ্রশ্রবা নিজেই তো সূত অর্থাৎ  ব্রাহ্মণ মা আর ক্ষত্রিয় পিতার সন্তান। তাই বর্ণসংকরের বিরুদ্ধে যত কথাই শান্তিপর্বে বা গীতায় থাকুক,  আমাদের মহাভারতের কবি অন্ততঃ সেসবকে জীবনের আচরণে পাত্তা দেননি।  আমাদের মনে হয় এই হলো কবি বেদব্যাসের কবিসুলভ বেদনাবোধ। নিজে শূদ্রা মাতার সন্তান বলেই তিনি নিজের জীবনে মনুসংহিতার রক্তের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাসী নন। বরং কুল নয়, কর্মে, পৌরুষে বিশ্বাসী।


সম্ভবত সেজন্যেই কর্ণকে দিয়ে তিনি  বলিয়ে নেন জন্ম নয় কর্ম আর পৌরুষই মূল কথা-- "দৈবায়ত্তং কুলে জন্ম, মদায়ত্তং তু পৌরুষম"।


তিনি কবি বলেই ক্রান্তদর্শী। আবার কুরুবংশের সব সংবাদ রাখেন। সেজন্য গান্ধারী জড় মাংসপিণ্ড প্রসব করলে তিনি ছুটে আসেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। দুর্যোধনাদির জন্মের পথ করে দেন। অথচ   তাই কৌরব পাণ্ডবের বিবাদ শুরুর আগেই তা তিনি অনুমান করতে পারেন এবং সেই দূষিত পরিবেশ থেকে সরিয়ে নিয়ে যান নিজের মা সত্যবতীকে।  আবার যতদিন পাণ্ডবরা দুর্বল ও অসহায়, ততদিন একচক্রা নগর কিংবা কাম্যক বন তিনি তাদের সুপরামর্শ দিতে উপস্থিত হন। কিন্তু পরামর্শই দেন, ঘটনাকে প্রভাবিত করেন না।  কুরুযুদ্ধের গতিপথ তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন না, দূর থেকে দেখেন।  রাজসূয় যজ্ঞে উপস্থিত হন।  কিন্তু এই যজ্ঞের ফলে জরাসন্ধ, শিশুপাল প্রমুখ কৃষ্ণবিরোধী রাজশক্তি পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে একজোট হবে, দুর্যোধনের  ঈর্ষা বাড়বে, পরিণামে স্থায়ীভাবে দুই রাজবংশের মধ্যে  শত্রুতা তৈরি হবে জেনেও তাকে আটকানোর চেষ্টা করেননা। পিতা বলেই ধৃতরাষ্ট্রকে সুপথে আনার জন্য সুপরামর্শ দেন। কিন্তু কোনো নির্দেশ দেন না। এটাই তাঁর বিশেষত্ব। প্রয়োজনে ছুটে আসেন।  যা দরকার তা করেন। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না। এই নির্লিপ্তি ঋষিসুলভ নাকি কবিসুলভ, তা নিয়ে  তর্ক করা যায়। কিন্তু এই নির্লিপ্তি ও দূরত্ব বোধহয় দরকার ঘটনাক্রমকে নিজের প্রভাবমুক্ত রাখতে। 


তিনি নিষাদপুত্র একলব্যকে গুরুদক্ষিণার নামে আঙুল খোয়াতে দেখেন।  কিন্তু এও বুঝিয়ে দেন, আঙুল  থাকলে ( সমান সুযোগ পেলে) নিষাদ একলব্যই শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হতে পারতো।

সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরকে দিয়ে দ্রোণবধের জন্য মিথ্যা বলান, আসলে বোঝান মানুষ দেবতা নয়। আবার সেই যুধিষ্ঠিরকেই সশরীরে স্বর্গ ও নরক দেখিয়ে দেবতাদের তার কাছে নতিস্বীকারে বাধ্য করেন। আসলে ব্যাস বলেন এবং একথা   প্রমাণও  করতে চান  যে মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই,  " ন হি মানুষাচ্ছ্রেষ্ঠতরং হি কিঞ্চিৎ।"


আর সেই মানুষের জয়গানেই  বেদবিভাজক, পণ্ডিত থেকে কবি বেদব্যাস আলাদা হয়ে যান। তাঁঁর মহাভারত  কোনো শুষ্ক ধর্মগ্রন্থ হয়ে না থেকে  হয়ে ওঠে দোষ গুণ মিলিয়ে মানুষের কাহিনি।

ধারাবাহিক ৩য় পর্বে.....

1 comment: