রবীন্দ্র-সাহিত্যে গৌতম বুদ্ধ(একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি)
দেবাশ্রিতা চৌধুরী
একটা স্থির নিঃসীম ঢেউ বয়ে চলেছে.. কোনো বাঁক নেই ,সমান.. সকাল দুপুর রাতে কোন পার্থক্য নেই।সুখবর দুঃখবরে কোন ফারাক নেই।মন নেই,যন্ত্রচালিতের মত দেহ চলছে। ঈশ্বর নেই, শয়তান নেই। সাদা টানটান পর্দায় কোন দাগ নেই,ভাঁজ নেই। রঙিনপর্দায় সাবধানবাণী নেই,ডেটার কসরত নেই,মৃতের সংখ্যা,স্বেচ্ছা অপসারণ,বাধ্য অপসারণ,গৃহ অপসারণ এই শব্দগুলোর অস্তিত্ব মুছে গেছে। এখান থেকে দূরে চলে যাই তাই ইচ্ছাকৃত অপসারণে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টির একটি অংশের সামান্য আলোচনার চেষ্টা করছি ,বৈশাখ কবি'মাস..
বৈশাখ মাস দুই মহামানবের জন্মমাস , অথবা বলা যায় আবির্ভাব দিবস। বৈশাখী পূর্ণিমায় শাক্যবংশে এক রাজপুত্রের জন্ম হয়েছিল ২৫০০ বছর আগে লুম্বীনি উদ্যানে(বর্তমান নেপাল)।
ইংরেজী ১৮৬১ সালের ৭ই মে (২৫শে বৈশাখ) জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
প্রথমজন রাজপুত্র হয়েও সারাজীবন সাধারণ মানুষের কথা ভেবেছেন,আর দ্বিতীয়জন তাঁর মানবতার দর্শনঅনুসারী হয়ে নিজেকে ঋদ্ধ করেছেন। অপূর্ব এই মেলবন্ধন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে গৌতম বুদ্ধ'র শিক্ষা ও দর্শনে,ঠিক ততটা আর কারো দ্বারা হয়তো হয়নি।সে হিসেবে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত না হয়েও রবীন্দ্রনাথই পরোক্ষভাবে বুদ্ধের বাণী ও দর্শনে প্রভাবিত হয়ে তাঁর(বুদ্ধ)কথা প্রচার করেছেন সবচেয়ে বেশি।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও গানে বৌদ্ধধর্মের(তথা বুদ্ধদেবের)বহুমাত্রিক প্রভাব বিশেষ ভাবে লক্ষনীয়।তাঁর পরমার্থচেতনার উৎস অনেকটা প্রভাবিত ছিল বুদ্ধ ও তাঁর ধর্মদর্শনে।রবীন্দ্র জীবনীকার কৃষ্ণ কৃপালনির কথায় জানা যায়,রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে,"জীবনে একবার মাত্র একটি মূর্তির সামনে আমার প্রণত হওয়ার প্রেরণা জেগেছিল,সেটা বুদ্ধগয়ায় যখন আমি বুদ্ধমূর্তি দর্শন করি।"--এই ব্যাপারটি সাধারণ অর্থেও সাধারণ নয়,তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও সাধারণ নয়,কারণ তাঁরা ব্রাহ্ম,নিরাকার ব্রহ্মের উপাসক,মূর্তিপুজোর ঘোর বিরোধী।তবুও বুদ্ধ'র পায়ে প্রণত হবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।তাঁর দৃষ্টান্ত কবি রেখে গেছেন কবিতায়,গানে,নাটকে,ভাষণে,ধর্মতত্ত্ব আলোচনায়।বুদ্ধদেবকেই কবি 'অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি'করেছেন এবং তাঁর বিচিত্র সৃষ্টির ভিতরে তাঁর প্রতি বারবার প্রণাম নিবেদন করেছেন।"বুদ্ধদেব"গ্ৰন্থে তাই। রবীন্দ্রনাথ লিখতে পারেন"ভারতবর্ষে বুদ্ধদেব মানবকে বড় করিয়াছিলেন।তিনি জাতি মানেন নাই,যাগযজ্ঞের অবলম্বন হইতে মানুষকে মুক্তি দিয়াছিলেন,দেবতাকে মানুষের লক্ষ্য হইতে অপসারণ করিয়াছিলেন।দয়া এবং কল্যান তিনি স্বর্গ হইতে প্রার্থনা করেন নাই,মানুষের অন্তর হইতেই তাহা তিনি আহ্বান করিয়াছিলেন।এমনি করিয়া শ্রদ্ধার দ্বারা,ভক্তির দ্বারা,মানুষের অন্তরের জ্ঞান শক্তি ও উদ্যমকে তিনি মহীয়ান করিয়া তুলিলেন।মানুষ যে দীন দৈবাধীন হীন পদার্থ নহে,তাহা তিনি ঘোষণা করিলেন।"
গৌতম বুদ্ধ দুঃখ কী, দুঃখের কারণ -দূর করার পথ অন্বেষণ তাঁর জীবনের মূল উদ্দেশ্যে পরিণত করেছিলেন। বলেছিলেন"অবিমিশ্র সুখ বলে কিছু নেই। মাঝে মাঝে যে সুখ আসে তাও দুঃখমিশ্রিত ও অস্থায়ী।"তাহলে সুখ বলে কিছু নেই? কামনা বাসনা থেকে নিস্তারের মাঝে অজ্ঞানের অবসান ঘটে!
ঠাকুর পরিবার ছিল নিরীশ্বরবাদী,আর গৌতম বুদ্ধ নিজেকে দেবতা বা ঈশ্বরপ্রেরিত কখনোই বলেননি।"মানবপুত্র" গৌতম বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর লেখা "বুদ্ধদেব"গ্ৰন্থে লিখেছেন"ভারতবর্ষে বুদ্ধদেব মানবকে বড় করিয়াছিলেন। তিনি জাতি মানেন নাই ,যাগযজ্ঞের অবলম্বন হইতে মানুষকে মুক্তি দিয়াছিলেন, দেবতাকে মানুষের লক্ষ্য হইতে অপসারণ হইতে অপসৃত করিয়াছিলেন। তিনি মানুষের আত্মশক্তি প্রচার করিয়াছিলেন। দয়া এবং কল্যান তিনি স্বর্গ হইতে প্রার্থনা করেন নাই, মানুষের অন্তর হইতেই তাহা তিনি আহ্বান করিয়াছিলেন। মানুষ যে দীন দৈবাধীন হীনপদার্থ নহে,তাহা তিনি ঘোষণা করিলেন।"
গৌতম বুদ্ধের শাশ্বত কল্যানের বানী রবীন্দ্রনাথের গানে ও কবিতায় বারবার ফিরে ফিরে এসেছে।বুদ্ধগয়ায় গেছেন কয়েকবার, সেখানে রচিত গানের সংখ্যাও কম নয়। তাছাড়া নাটকের গানেও বুদ্ধচেতনার প্রকাশ রয়েছে,বিশেষত 'মালিনী' 'রাজা' 'অচলায়তন' 'গুরু' 'অরূপরতন''নটীর পূজা' 'চন্ডালিকা' 'শ্যামা' ইত্যাদি তার প্রমাণ।"কথা ও কাহিনী"কাব্যের প্রায় পুরোটাই ,শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা,মস্তক বিক্রয়,পূজারিণী,অভিসার,পরিশোধ,সামান্য ক্ষতি,নগরলক্ষী ইত্যাদি ও বেশ কিছু নাটকে ,যেমন ,শাপমোচন-এ ও বৌদ্ধ আখ্যানের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বৌদ্ধধর্মের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য ও নীতি রবীন্দ্রনাথকে
গভীরভাবে আকর্ষণ করেছে।এ প্রসঙ্গে প্রবোধ চন্দ্র সেন বলেছেন "হিংসা,বিশ্বমৈত্রী, করুণা,ত্যাগ,ঐক্য, সংহতি এবং সর্বমানবের সমতা -এই কয়টি নীতির জন্য বৌদ্ধসংস্কৃতি ও রবীন্দ্রসংস্কৃতি গভীর যোগসূত্রে গাঁথা--"
তাই কবি লিখতে পারেন.... "আপনারে দীপ করি জ্বালো;/
সত্যলক্ষ্যে যেতে হবে অসত্যের বিঘ্ন করি দূর;
জীবনের বীনাযন্ত্রে বেসুরে আনিতে হবে সুর"-
পারিবারিক ভাবেও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম বৌদ্ধধর্মের যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধের জন্মস্থান , শ্যামদেশ, জাপান, চীন, মায়ানমার, তিব্বত, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা পরিভ্রমণ করেছিলেন।
বরোবুদুরের মন্দিরের সামনে কবি বলেছেন..
"সর্বগ্ৰাসী ক্ষুধানল উঠেছে জাগিয়া
তাই আসিয়াছে দিন,পীড়িত মানুষ মুক্তিহীন...
আজকের দিনে এতটাই প্রাসঙ্গিক , অবাক লাগে।
নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গে...
"আমি ঢালিব করুণার ধারা
আমি ভাঙিব পাষানকারা.."
এই হিংসা, হানাহানি,রোগেশোকে দীর্ণ পৃথিবীর বুকে লেখা রয়েছে তাঁদের মননের ইতিহাস। আমরা অন্তরে স্মরণ ও শ্রদ্ধায় এই দুই মহামানবকে শ্রদ্ধা ও প্রণতি জানাই।
No comments:
Post a Comment