রাহুল সিনহার মহাভারত মহাসাগর- ৪
কুরু - পাণ্ডব, নাকি কুরু- পাঞ্চাল যুদ্ধ?
মহাভারতের যুদ্ধে কৌরবরা ধ্বংস হলেন আর জয়ী হলেন, রাজ্য পেলেন পাণ্ডুর সন্তানরা। কিন্তু আসলে এটাই কি যুদ্ধের প্রকৃত সত্য? নাকি এই যুদ্ধশেষে আসলে শেষ হয়ে গেলো প্রাচীন ও পুরুষানুক্রমে সংঘর্ষরত দুটি রাজবংশ যাদের উৎপত্তি একই মূল বংশ থেকে? কুরুযুদ্ধে কৌরবদের আসল প্রতিপক্ষ কি যুধিষ্ঠির ও তাঁঁর ভাইয়েরা? নাকি আসলে এই ১৮ দিনের যুদ্ধে আসলে পাণ্ডবরাই শিখণ্ডী? যাদের সামনে রেখে নিজেদের অতীত জ্ঞাতিবৈরের রক্তাক্ত সমাধান খুঁজেছেন কৌরব এবং পাঞ্চালরা?
এই প্রশ্নের জবাব আমরা খুঁজবো অঙ্কের নিয়মে। মানে ফলাফল দেখে পেছন থেকে সামনের দিকে এগোতে থাকলে যেমন গাণিতিক সমীকরণের প্রথম চেহারাটা পেছন থেকে অঙ্ক কষে এসে শেষ ধাপে বের করা যায়, অনেকটা সেরকম কায়দায়। বা বলা যাক গাছের গল্প শুনে নয়, তার ফল দিয়ে গাছকে চেনার চেষ্টা। আসলে গল্পটার উপসংহার আর আশেপাশের টুকরো টুকরো সূত্র ধরে রহস্যকাহিনীর আসল সত্যসন্ধানের মতো। তাই আমাদের প্রথমেই যেতে হবে, কুরুযুদ্ধের সংঘর্ষময় বর্ণনার শেষ তথা সবচেয়ে নৃশংস অধ্যায় অর্থাৎ সৌপ্তিক পর্বে। আসলে তারও একটু আগে শল্যপর্ব থেকে।
কুরুযুদ্ধের শেষ দিন। ভীষন গদাযুদ্ধের পর ভীম দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করলেন। রাজা দুর্যোধন রুধিরাক্ত শরীরে ভূমিশয্যা নিলেন। সংকর্ষণ বলরাম অন্যায় যুদ্ধে প্রিয় শিষ্যের পরাজয় দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে চলে গেলেন। বিজয়ী পাণ্ডবরাও কৃষ্ণ সমেত প্রস্থান করলেন। সূর্য ডুবে এলো। এই সময় দুর্যোধনকে খুঁজতে খুঁজতে এসে উপস্থিত হলেন কৌরবদের বংশগুরু কৃপাচার্য, তাঁঁর ভাগ্নে দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা এবং যদুবংশীয় কৃতবর্মা। রাজার এই দশা দেখে ক্রুদ্ধ অশ্বত্থামা প্রতিশোধ নিতে কৃতসংকল্প হলেন। প্রতিজ্ঞা করলেন, " আজ বাসুদেব সমক্ষেই সমস্ত পাঞ্চালগণকে শমনভবনে প্রেরণ করিব; তুমি আমাকে অনুজ্ঞা প্রদান কর।"
বিজয়ী পাণ্ডবদের সিংহনাদ তখনও শোনা যাচ্ছে। তিন কৌরবপক্ষীয় যোদ্ধা এক গভীর অরণ্যে এক সহস্রশাখাসঙ্কুল বটগাছের নিচে আশ্রয় নিলেন। রাত গভীর হলে অন্য দুজন নিদ্রাভিভূত হলেও অশ্বত্থামার ঘুম এলোনা। এরপর দেখতে পেলেন এক মস্ত পেঁঁচা এসে বটগাছে কাকেদের বাসায় হানা দিলো। এবং ঘুমন্ত অবস্থায় কাকেদের হত্যা করলো। এই দৃশ্য দেখে ঘুমন্ত শত্রু নিধনের পথ পেলেন অশ্বত্থামা। এখানে রাতে নিদ্রামগ্ন শত্রুর ওপর আক্রমণের ঔচিত্য, অনৌচিত্য নিয়ে কৃপাচার্য ও অশ্বত্থামার মধ্যে তর্ক বিতর্কের যে বিবরণ মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে আছে তাতে বারবার কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদে পাঞ্চালদের নাম এসেছে। অশ্বত্থামা স্পষ্ট বলেছেন " দুরাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্ন নিশিত শরনিকরে সহস্র যোদ্ধার প্রাণ সংহার করিয়া আমার অস্ত্রত্যাগী পিতাকে নিপাতিত করিয়াছে। আজ আমি সেই বর্ম্মবিহীন, পাপপরায়ণ দ্রুপদপুত্রকে নিহত করিব।"
এরপরই সৌপ্তিক পর্বে পাচ্ছি অশ্বত্থামা পাণ্ডবদের শিবিরে উপস্থিত হলেন। সেখানে তিনি প্রথমেই আক্রমণ করলেন ধৃষ্টদ্যুম্মকে। কোনো অস্ত্র দিয়ে নয়, পা দিয়ে গলা টিপে তাকে হত্যা করলেন। এরপর একে একে মারলেন যুধামন্যু, উত্তমৌজা, শিখণ্ডী এবং দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্রকে। সৌপ্তিক পর্বের অন্ধকার রাতের এই বীভৎস যুদ্ধ বর্ণনায় যাদের মৃত্যুর খবর মহাভারতের কবি আমাদের জানিয়েছেন তাদের সবাই সোমক-পাঞ্চাল। পাণ্ডবদের যে পাঁঁচ ছেলে বেঘোরে মারা গেলো তারাও পাঞ্চালদেরই ভাগনে। এই ঘোর নিশাযুদ্ধের আগে মহাভারতে অশ্বত্থামার সঙ্গে শিবের দেখা হওয়ার একটা বর্ণনা আছে। সেখানে দ্রোণপুত্রকে শিব বলছেন, "...... পাঞ্চালরা কালগ্রস্ত হইয়াছে, আজ তাহাদিগের জীবনরক্ষা হইবে না।" যুদ্ধ শেষে যখন অশ্বত্থামা কৃপ ও কৃতবর্মার সঙ্গে মিলিত হলেন তখন তাঁঁরাও বললেন, আমরাও অসংখ্য পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়কে উৎসন্ন করিয়াছি।"
শল্য ও সৌপ্তিক পর্বের এই যে বিবরণটুকু এখানে আমরা পেলাম, তাতে আমরা দেখছি, কৌরবদের শেষ সেনাপতি অশ্বত্থামা বা কৃপাচার্যের আক্রমণের মূল লক্ষ্য পাণ্ডবরা নন, বরং সৃঞ্জয়-পাঞ্চালরাই। কৌরব এবং পাঞ্চালরাই শেষ যুদ্ধে সর্বস্বান্ত হলেন। কিন্তু পাণ্ডবরা অক্ষত রইলেন। সেজন্যই এই প্রশ্ন ওঠে, এ কি আসলেই কুরু পাণ্ডব যুদ্ধ?
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আর তার জবাব পেতে আমরা এবার একেবারে আদি পর্বে যাবো। চেষ্টা করবো সেই সূত্র খুঁজে বের করতে যেখান থেকে কৌরব এবং পাঞ্চাল রাজবংশের শত্রুতা শুরু।
কৌরবদের বংশের এক নামকরা রাজা ছিলেন হস্তী। হস্তীর নামেই হস্তিনাপুরের নামকরণ। এই রাজা হস্তীর নাতি হলেন অজমীঢ়। আদিপর্বে একজায়গায় উল্লেখ আছে অজমীঢ়ের ছয় পুত্র আবার অন্যত্র বলা হয়েছে ছেলে ২৪টি। এদের মধ্যে একজন হলেন দুষ্মন্ত (শকুন্তলার দুষ্মন্ত নন। কুরুবংশে জনমেজয়, পরীক্ষিৎ, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, ভীমসেন সহ বেশ কিছু নাম কয়েক পুরুষ পর পর ব্যবহার হয়েছে।) আদিপর্বে বলা হয়েছে এই অজমীঢ়নন্দন দুষ্মন্তই পাঞ্চালবংশের স্রষ্টা। অজমীঢ়ের এক স্ত্রী হলেন নীলিনী। তিনিই দুষ্মন্তের মাতা। এই বংশধারায় কয়েক পুরুষ পরে পাঁঁচটি ছেলে জন্মালো যাদের নাম মুদ্গল, সৃঞ্জয়, বৃহদিষু, যবীনর এবং কৃমিলাশ্ব। এরা ৫টি রাজ্য সংরক্ষণে সমর্থ, তাই এদের নাম হলো পঞ্চাল। " অলং সংরক্ষণে তেষাং পঞ্চালা ইতি বিশ্রুতাঃ"। এদেরই রাজ্য হলো পাঞ্চাল। পুরাণে মহাভারতে এলাকার যে বর্ণনা আছে, তাতে বলা যায় এই রাজ্য ছিলো এখনকার উত্তরপ্রদেশের বেরিলি, বদাউন, ফারুকাবাদ, রোহিলখণ্ড এলাকা এবং গঙ্গা যমুনার মাঝ বরাবর কিছু অংশ। সুতরাং এরা সকলেই আসলে আদি হস্তিনাপুর রাজবংশেরই শাখা। মহাভারতের মূল কাহিনির সময়পর্বে সেখানকার রাজা দ্রুপদ। নিজেদের বংশের পাঁঁচ প্রতিষ্ঠাতার নামে এদের রাজ্যের নাম পাঞ্চাল, বংশের প্রথম বিখ্যাত রাজা সৃঞ্জয়ের নামে এরা নিজেদের সৃঞ্জয় বলেও পরিচয় দেন। কিন্তু আবার সোমক বলেও পরিচয় দেন। সোমকের সামান্য উল্লেখ আমরা পরে করবো। সৃঞ্জয়ের বংশের আরেক বিখ্যাত রাজা হলেন সুদাস বা সুদা। তার সঙ্গে যুদ্ধ হয় হস্তিনাপুরের রাজা সংবরণের। তাকে হস্তিনাপুর ছেড়ে পালাতে হয়। পাঞ্চালদের রাজত্ব ও প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যায়। পরে সংবরণ, মথুরার যাদবেরা, যযাতির আরও তিন পুত্র দ্রুহ্য, অনু এবং তুর্বসুর বংশধররা এবং মৎস্যদেশের রাজা একযোগে সুদা বা সুদাসের বিরুদ্ধে একজোট হন। এর ফলেই সংবরণ নিজের রাজ্য ফিরে পান, পাঞ্চালদের ক্ষমতা কমে আসে।
সুদার পৌত্র সোমকের ছেলে জন্তুর উল্লেখ আছে মহাভারতে। তাতে এক ছেলে থেকে তার ১০০ ছেলে হবার একটা গল্প রয়েছে। আমাদের মতে ১০০ ছেলের রূপকে আসলে এখানে সোমকের হাত ধরে পাঞ্চালদের পুরনো শক্তি ও ক্ষমতা এবং সমৃদ্ধি ফিরে পাওয়ারই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সেজন্যই পাঞ্চাল রাজবংশ নিজেদের সোমকবংশীয় বলেও পরিচয় দেয়। এই সোমকেরই কয়েক পুরুষ পরে আমরা পাবো পৃষতকে। মাঝখানে এই শূন্যতার কারণ হয়তো এই যে ততদিন পাঞ্চালরা কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধে সুবিধা করে উঠতে পারেনি। পৃষতই ফের পাঞ্চালদের পুরনো বৈভব ফিরিয়ে আনলেন। সুতরাং কৌরব আর পাঞ্চালদের যুদ্ধের ইতিহাস অনেক পুরনো।
এবার একটু এগিয়ে আমরা শান্তনুর সময়ে আসবো। পাঞ্চালে পৃষত আর হস্তিনাপুরে শান্তনু সমসাময়িক। শান্তনু ঋষি গৌতমের পুত্র কন্যাকে পালন করেন তারাই কৃপ ও তার বোন কৃপী। এই কৃপকেই কৌরবরা তাদের কুলগুরু পদে বরণ করলেন। এরই বোন কৃপীকে পরে বিয়ে করলেন ভরদ্বাজনন্দন দ্রোণ। এই দ্রোণের বাবা ভরদ্বাজ এবং পাঞ্চালের রাজা পৃষত একে অন্যের বন্ধু। দুজনে ছেলে দ্রোণ এবং দ্রুপদও বন্ধু হলেন ঋষি অগ্নিবেশের কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতে গিয়ে। বন্ধুত্ব এতটাই গাঢ় হলো যে দ্রুপদ দ্রোণকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসলেন, " হে দ্রোণ আমি পিতার প্রিয়তম পুত্র। তিনি যখন আমাকে পাঞ্চাল রাজ্যে অভিষিক্ত করিবেন, আমি শপথ করিতেছি, তৎকালে আমার যাবতীয় ভোগ, সম্পত্তি ও সুখ সমস্তই তোমার অধীন হইবে।"
এই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিজ্ঞা ইত্যাদির পর আশ্রমবাসের পর্ব শেষ হলো। দ্রুপদ পিতার রাজ্যে ফিরলেন। দ্রোণ অস্ত্রবিদ্যায় আরও উচ্চশিক্ষার জন্য গেলেন ভার্গব পরশুরামের কাছে। তাঁর কাছ থেকে যাবতীয় অস্ত্র চালনা শিখলেন। মহাভারত বলছে দ্রোণ পরশুরামের কাছে ধনলাভ করতে গিয়েছিলেন। আমরা বলবো, তিনি পরশুরামের কাছে ধনুর্বিদ্যার উচ্চতর শিক্ষার জন্যই গিয়েছিলেন। কারণ এর আগে পরশুরামই ভীষ্মকেও অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছেন। পরে কর্ণকেও তাঁঁর কাছেই অস্ত্রশিক্ষা পেতে দেখেছি। তবে একই পরশুরাম যিনি ২১ বার পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করেছেন, রামায়ণের যুগে হরধনু ভঙ্গের পর রামকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তিনিই ভীষ্ম, দ্রোণ এবং কর্ণের অস্ত্রগুরু, এমনটা হয়তো বাস্তবে সম্ভব নয়। হয়তো পরশুরামের বংশধর ভার্গব ব্রাহ্মণরা অস্ত্র চালনার শিক্ষাদানের রীতি ধরে রেখেছিলেন।
সেসব পর্ব শেষ হলো। কিন্তু এত বিদ্যার অধিকারী হয়েও দ্রোণের উপযুক্ত জীবিকার ব্যবস্থা হলোনা। একদিন ছেলে অশ্বত্থামাকে পিটুলি গোলা জল খেয়ে 'দুধ খেয়েছি' বলে নৃত্য করতে দেখে দুঃখিত দ্রোণের পিতৃহৃদয়ে ছেলেবেলার বন্ধুর কথাই প্রথম উদয় হলো। সাহায্যের আশায় তিনি গেলেন বাল্যবন্ধু দ্রুপদের কাছে। কিন্তু দ্রুপদের মুখে আমরা শুনতে পাচ্ছি, "হে ব্রহ্মণ! তুমি হঠাৎ আসিয়া আমাকে সখা বলিয়া সুবুদ্ধির কার্য্য কর নাই; পূর্বে তোমার সহিত আমার সখ্য ছিল যথার্থ বটে, কিন্তু এখন তুমি আর আমার বন্ধুর উপযুক্ত নও; অশ্রোত্রিয় কখন শ্রোত্রিয়ের সখা হইতে পারে না; অরথীর সহিত রথীর সখ্য হওয়া নিতান্ত অসম্ভব; সমানে সমানে বন্ধুতা হওয়াই উচিত; অসমানের সহিত বন্ধুতা করা অবিধেয়। সখ্য চিরকাল সমভাবে থাকিবার নহে। হয় কাল, নতুবা পরস্পরের ক্রোধ উহাকে বিনাশ করে।...... তুমি কহিতেছ, আমি তোমার সহিত একত্র রাজ্যভোগ করিব বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, কিন্তু তাহার বিন্দুমাত্রও আমার স্মরণ হইতেছে না। এক্ষণে কেবল একরাত্রির নিমিত্ত তোমাকে ভোজন প্রদান করিতে পারি।"
দ্রুপদের এই আকস্মিক দুর্ব্যবহার আশ্চর্যজনক। তাতে দ্রোণের জন্য আমাদের খারাপ লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের ধারণা তুখোড় রাজনীতিবিদ দ্রুপদ স্রেফ ধনগর্বে এসব কথা বলেননি। তিনি রাজা এবং পাশের বিশেষ করে দীর্ঘকালীন শত্রু রাজ্য হস্তিনাপুরের সব খবরই রাখেন। এককালের বন্ধু দ্রোণ যে শান্তনুর পালিতা কন্যা কৃপীকে বিয়ে করেছেন এবং হস্তিনাপুর রাজবংশের কুলপুরোহিত কৃপাচার্য যে দ্রোণের শালা সে খবর তিনি ভালো করেই জানেন। এ অবস্থায় দ্রোণের সঙ্গে সখ্য এবং তাঁঁকে পুরনো বন্ধুত্বের সুবাদে পাঞ্চাল রাজ্যের সমান ভাগের অধিকার দেবার অর্থ হবে তার নিজের রাজ্যের ঘাড়ে হস্তিনাপুর সিংহাসনের শ্বাস ফেলার সুযোগ করে দেওয়া। সেটা হতে দিতে চাননি বলেই দ্রুপদের এই ভোল বদল। আর সেটা রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথ ছিলো বলেই যিনি এতে ক্ষতিগ্রস্ত সেই দ্রোণ ছাড়া আর কোনো চরিত্র সে গল্প বলছেন না। এমনকি ব্রাহ্মণদের এমন দাপটের দিনেও আর কোনো ব্রাহ্মণের মুখে সেজন্য দ্রুপদের সমালোচনা শুনতে পাচ্ছি না আমরা। বরং অন্যত্র ব্রাহ্মণরা এই বলে দ্রোণের সমালোচনা করেছেন যে তিনি রাজার কাছে ব্রাহ্মণের মর্যাদা অনুযায়ী সাহায্য ভিক্ষা করলেই সমুচিত হতো।
দ্রোণ হস্তিনাপুর এসে কৌরব ও পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু হলেন। অর্জুন প্রথম থেকেই তাঁঁর প্রিয়তম শিষ্য হয়ে উঠলেন। সেটার পেছনে অর্জুনের একাগ্রতা, নিষ্ঠা, যোগ্যতাও নিশ্চয়ই ছিলো। কিন্তু শুধু সেগুলোই একমাত্র কারণ নয়। দ্রোণ আসলে একটি অস্ত্রের সন্ধান করছিলেন যার আঘাতে তিনি দ্রুপদের কাছে পাওয়া অপমানের শল্য নিজের হৃদয় থেকে উৎপাটন করতে পারেন। সুতরাং শিক্ষা শেষ হবার পর যখন গুরুদক্ষিণা দেবার সময় এলো তখন তিনি শিষ্যদের কাছে দক্ষিণা হিসেবে দ্রুপদকে জীবিত ও বন্দী অবস্থায় ধরে আনতে বললেন। কৌরবরা প্রথমেই দ্রুপদের রাজধানী অহিচ্ছত্রপুর আক্রমণ করে যুদ্ধ শুরু করলেন। কিন্তু দ্রুপদ ও তার সেনাবাহিনীর হাতে বেধড়ক মার খেয়ে রণে ভঙ্গ দিলেন। এরপর যুদ্ধে গেলেন পাণ্ডবরা। অর্জুন পাঞ্চাল সৈন্যদের পরাস্ত করে দ্রুপদকে বন্দী করলেও সম্মানিত রাজা এবং কুরুবংশের প্রাচীন আত্মীয় বিবেচনায় তাঁঁকে যথাযথ মর্যাদায় গুরুর কাছে উপস্থিত করলেন। এরপর মহাভারতে যেমন আছে দ্রোণ পাঞ্চাল রাজ্যের সমৃদ্ধ উত্তরাংশ নিজের দখলে রেখে দক্ষিণাংশ দ্রুপদকে ফিরিয়ে দিলেন। আপাতত শান্তি স্থাপিত হলো। কিন্তু দ্রুপদের মনে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগলো। তিনি এমন এক পুত্রের জন্য যজ্ঞ করলেন যে দ্রোণকে বধ করতে সমর্থ।
যজ্ঞের আগুন থেকে ধৃষ্টদ্যুম্ন ও দ্রৌপদীর জন্ম আমাদের মতে আসলে রূপক। দ্রোণ সংহার এবং তার আশ্রয়দাতা হস্তিনাপুরকে ধ্বংস করতে দ্রুপদের হৃদয়ে যে প্রতিশোধের আগুন সেই আগুন থেকেই এই দুই পুত্র কন্যার জন্ম। সে যাই হোক, রাজনীতিজ্ঞ দ্রুপদ এই যুদ্ধে অর্জুনের রণনৈপুণ্য দেখলেন। পাণ্ডব এবং কৌরবদের জ্ঞাতিবৈর যে হস্তিনাপুর রাজবংশের মধ্যে আড়াআড়ি বিভাজন তৈরি করছে এও নিশ্চিতভাবেই তাঁঁর চোখ এড়ায়নি। বারণাবতে জতুগৃহে আগুন দিয়ে পাণ্ডবদের হত্যার চেষ্টার খবরও তিনি জানতেন। এর ফলে কুরু রাজবংশের বিভাজন যে অনিবার্য এটাও বুঝতে তাঁঁর অসুবিধে হবার কথা নয়।
তিনি এর সুযোগ নিতে চাইলেন। আমাদের মতে দ্রুপদ আগাগোড়াই চাইছিলেন অর্জুনই দ্রৌপদীকে বিয়ে করুন। সাধারণ স্বয়ংবরসভা আয়োজন না করে জলের দিকে তাকিয়ে উপরে ঘুরন্ত চক্রের মধ্যে থাকা মাছের চোখে লক্ষ্যভেদ করার শর্ত দ্রুপদ অকারণে করেননি। তাঁঁর স্থির বিশ্বাস ছিলো এই ধরনের কঠিন শর্ত পূরণ একমাত্র অর্জুনের পক্ষেই সম্ভব। যদিও কর্ণ ধনুক তুলে তাতে গুণ চড়িয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু সূতপুত্র বলে দ্রৌপদী যে তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন সেটা আসলে তার জন্ম পরিচয়ের জন্য নয়। কারণ দ্রুপদ এবং পাঞ্চালরা আসলে অর্জুনকে আগে থেকেই বাছাই করে রেখেছেন। সেজন্যই স্বয়ংবর সভার পর তিনি পাণ্ডবদের পেছনে ধৃষ্টদ্যুম্নকে গোপনে পাঠিয়েছেন। ফিরে আসার পর জিজ্ঞেস করেছেন, ".... তুমি যথার্থ করিয়া বল, কে আমার কন্যাকে গ্রহণ করিয়াছে? যথার্থই কি পার্থ শরাসন গ্রহণপূর্বক লক্ষ্যভেদ করিয়াছেন?" ধৃষ্টদ্যুম্ন সমস্ত বিবরণ শুনিয়ে পিতাকে বলছেন, " যাহা হউক, এতদিনে আমাদের আশা ফলবতী হইল। শুনিয়াছি, পাণ্ডবেরা অগ্নিদাহ হইতে মুক্ত হইয়াছেন। বোধ হয় তাঁঁহাদিগের অন্যতম শরাসনসজ্য ও লক্ষ্যবিদ্ধ করিয়াছেন। " সুতরাং বুঝতে অসুবিধে হয় না, কৃষ্ণাকে পাবার জন্য দ্রুপদের তরফে যে ঘূর্ণ্যমান মাছের চোখ বিদ্ধ করার শর্ত ছিলো, তার পেছনে তাঁরও পাখির চোখ ছিলো লক্ষ্যভেদ যেন অর্জুনই করেন। আর সেটা শুধু রাজার নয় বরং গোটা পাঞ্চাল রাজ পরিবারের তরফেই আগে থেকে ঠিক করা ছিলো। যদি সেটাই না হতো, তবে অর্জুনের আগে কর্ণ যখন ধনুক তুলে তাতে গুণ চড়িয়ে লক্ষ্যভেদ করার জন্য প্রস্তুত, তখন দ্রৌপদীকে দিয়ে "সূতপুত্রকে বরণ করবো না" এ কথা বলার কোনো যুক্তিসংগত কারণ পাওয়া যায় না।
এবার আমরা আরও সামনের দিকে চোখ রাখবো। সভাপর্বে কপট পাশাখেলায় পাণ্ডবরা হারলেন। হস্তিনাপুর রাজসভায় কুরুবংশের কূলবধূ দ্রৌপদীর চরম অবমাননা হলো। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ সহ কুরুবৃদ্ধরা নীরব রইলেন। অসভ্যতার জন্য দুর্যোধন, দুঃশাসন এবং কর্ণকে চরম শাস্তি দেবার শপথ নিলেন ভীম এবং অর্জুন। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, ভীমার্জুনের প্রতিজ্ঞার কারণ কপটদ্যূতে রাজ্য হরণ যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি পাঞ্চালীর অপমান। তাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ষতটা পাণ্ডবদের হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করার, ঠিক ততটাই দ্রৌপদীর অপমানের প্রতিশোধ নেবারও। মনে করে দেখুন, আদিপর্বে দ্রৌপদীর জন্মলগ্নেই কথিত হয়েছে " অস্যা হেতোঃ কৌরবাণাং মহদুৎপৎস্যতে ভয়ম" (এই কন্যার কারণেই কুরুবংশের মহা ভয় উৎপত্তি হবে)। এ থেকে এমনটা মনে হওয়া কি খুব অস্বাভাবিক যে দ্রুপদের লক্ষ্য ছিলো দ্রোণ সহ তাঁঁকে আশ্রয়দাতা কৌরবদের সমূল বিনাশ? এর পেছনে কৌরব ও পাঞ্চালদের সেই বংশানুক্রমিক বৈরিতা। যাকে চূড়ান্ত পরিণামে নিয়ে যেতেই ভরতবংশের রাজ্যচ্যুত পাণ্ডবশাখাকে নিবিড়ভাবে আশ্রয় করেছেন দ্রুপদ।
যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে পা বাড়াবার আগে তার প্রস্তুতির দিকে চোখ রাখলেও আমরা দেখবো কী করে এই যুদ্ধ অন্তত মানসিক স্তরে এবং কৌশলগত দিক থেকেও মূলত কুরু পাঞ্চাল যুদ্ধ।
মহাভারতের কাহিনী সম্পর্কে অভিজ্ঞ পাঠক জানেন, অজ্ঞাতবাসের শেষে অভিমন্যু ও উত্তরার বিয়ে হবার পর বিরাটরাজ্যের উপপ্লব্য নগরে পাণ্ডবরা নিজেদের মন্ত্রণাসভায় বসলেন। সেখানে প্রথম সভাতে কৃষ্ণ পাণ্ডবদের ভবিষ্যৎ কর্তব্য বিষয়ে সবার মত জানতে চাইলে বলরাম সন্ধির পক্ষে মত দিলেন। অর্জুন শিষ্য তথা যাদববীর সাত্যকি অবিলম্বে যুদ্ধের পথ অনুমোদন করলেন। কিন্তু মূল কথা বললেন পাণ্ডবদের শ্বশুরমশাই বৃদ্ধ রাজা দ্রুপদ। দ্রুপদ শুধু যুদ্ধ প্রস্তাব অনুমোদনই করলেন না, রণনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবার আগে সৈন্য সংগ্রহ এবং বন্ধু রাজাদের কাছে দূত পাঠানোর উপদেশ দিলেন। লক্ষ্য, কুরুপক্ষের আগে পাণ্ডব শিবিরে যত বেশি সম্ভব মিত্রশক্তিকে সমবেত করা, যাতে সৈন্য সংখ্যা ও মিত্র সংখ্যার অনুপাতে যুদ্ধ শুরুর আগেই এগিয়ে থাকা যায়।
বাসুদেব কৃষ্ণ আগাগোড়াই চাইছিলেন যুদ্ধ হোক। কিন্তু নিজের মনের ভাব শেষ পর্যন্ত প্রচ্ছন্ন রেখেছেন। তাই দ্রুপদের প্রস্তাব সমর্থন করেও যুদ্ধারম্ভের দায় যাতে পাণ্ডবশিবিরের ওপর না পড়ে, সেজন্য কৌরবসভায় দূত পাঠানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু সেটা পাণ্ডব শিবিরে মিত্রশক্তির সৈন্য সমাগম প্রায় শেষ হয়ে আসার পর। আর দূত হিসেবে কে গেলেন? বনবাস ও অজ্ঞাতবাস সফলভাবে শেষ করার পর যুধিষ্ঠির নিজেই চার ভাইকে নিয়ে হস্তিনাপুর ফিরে গিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থের ওপর অধিকার দাবি করতে পারতেন। নিজেরা না গেলে নিজেদের কূলপুরোহিত ধৌম্যকে পাঠাতে পারতেন। কিন্তু কৌরবসভায় দূত হিসেবে গেলেন দ্রুপদের কুলপুরোহিত। আর তাতে যুধিষ্ঠির প্রমুখ কোনো শব্দও করলেন না। পুরোহিত কুরুসভায় গিয়ে কী বার্তা দেবেন তাও সবিস্তারে বলে দিলেন পাঞ্চালরাজ নিজেই। ঝগড়া যদি শুধুই কুরু ও পাণ্ডবের হতো তাহলে দূত কী বলবেন সেই বার্তা তো খোদ যুধিষ্ঠিরের তরফেই সংজ্ঞাপিত হবার কথা। সেটা নয়, বরং পাণ্ডবদের সামনে রেখে এটা পাঞ্চালদেরই যুদ্ধোদ্যম বলেই দূত নির্বাচন থেকে দূতের বক্তব্য সবটাই ঠিক করে দিচ্ছেন দ্রুপদ নিজে।
এই যুদ্ধ যে আসলে পাঞ্চালদের জন্য অনেক বেশি জরুরি তার প্রমাণ কৃষ্ণের দৌত্যের আগে দ্রৌপদীর বক্তব্য। কৃষ্ণ যখন শান্তিদূত হিসেবে হস্তিনাপুর রাজসভায় যাচ্ছেন তার আগে যুধিষ্ঠির তো বটেই, ভীম এবং অর্জুনও সওয়াল করেছেন শান্তির পক্ষে। ভীম বলছেন,
" যথা যথৈব শান্তিঃ স্যাৎ কুরূণাং মধুসূদন!
তথা তথৈব ভাষেথা মাস্ম যুদ্ধেন ভীষয়েঃ।।
অমর্ষী জাতসংরম্ভঃ শ্রেয়োদ্বেষী মহামনাঃ।
নোগ্রং দুর্যোধনো বাচ্যঃ সাম্নৈবৈনং সমাচরেঃ।।"
(মধুসূদন, যে যে ভাবে কৌরবদের শান্তি হয়, তুমি সেভাবেই কথা বলবে, কিন্তু যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে তাদের ভীত করার চেষ্টা করো না। অসহিষ্ণু, জাতক্রোধ, শুভদ্বেষী এবং দুরাকাঙ্ক্ষী দুর্যোধনকে রূক্ষ কথা বলো না, তার সঙ্গে মধুরভাবেই কথা বলো।)
শুধু তাই নয়, অর্জুনও যুদ্ধ এড়াতে চেয়ে উভয়পক্ষেরই হিতসাধন করতে কৃষ্ণকে অনুরোধ করে বলেছেন,
"পাণ্ডবানাং কুরূনাঞ্চ ভবান্ নঃ প্রথমঃ সুহৃৎ।
সুরানামসুরাণাঞ্চ যথা বীর! প্রজাপতিঃ।।
কুরূণাং পাণ্ডবাণাঞ্চ প্রতিপৎ স্ব নিরাময়ম।
অস্মদ্ধিতমনুষ্ঠানং মন্যে তব ন দুষ্করং।।"
(ব্রহ্মা যেমন দেবতা ও অসুর দু'পক্ষেরই প্রধান সুহৃদ তেমনই তুমিও কৌরব ও আমাদের প্রধান সুহৃদ। তুমি কৌরব ও পাণ্ডবদের মনের দুঃখ দূর করো। আমি মনে করি, আমাদের হিতসাধন করা তোমার পক্ষে দুষ্কর হবে না।)
আর এতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন দ্রৌপদী। ভীম, অর্জুনের মুখে শান্তির সুর শুনে বাসুদেবকে পাঞ্চালী বলছেন
"অয়ন্তু পুণ্ডরীকাক্ষ! দুঃশাসনকরোদ্ধৃতঃ।
স্মর্তব্যঃ সর্বকার্যেষু পরেষাং সন্ধিমিচ্ছতা।।
যদি ভীমার্জুনৌ কৃষ্ণ কৃপণৌ সন্ধিকামুকৌ
পিতা মে যোৎস্যতে বৃদ্ধঃ সহ পুত্রৈর্মহারথৈঃ।।
পঞ্চ চৈব মহাবীর্য্যাঃ পুত্রা মে মধুসূদন!
অভিমন্যুং পুরস্কৃত্য যোৎসন্তে কুরুভিঃ সহ।।"
(কৃষ্ণ, তুমি সন্ধির জন্য গিয়ে সব কাজের সময়ে আমার এই কেশের কথা মনে রাখবে যা দুঃশাসন তার হাত দিয়ে ধরেছিলো। যদি ভীম ও অর্জুন যুদ্ধ কৃপণ হয়ে সন্ধি কামনা করেন তবে আমার বৃদ্ধ পিতা তাঁর মহারথী পুত্রদের নিয়ে যুদ্ধ করবেন, আর আমার পাঁঁচ মহাবীর পুত্র অভিমন্যুকে সামনে রেখে কৌরবদের বিরুদ্ধে লড়বে।)
সুতরাং এটা বুঝতে অসুবিধে হয় না, পাণ্ডবরা শান্তি চাইলেও যুদ্ধ হতোই। প্রয়োজনে পঞ্চ পাণ্ডবকে বাদ দিয়ে সৃঞ্জয়বংশীয় বীররাই যুদ্ধে যেতেন। আর পাণ্ডব শিবিরে অর্জুনের মতো সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর থাকতেও ধৃষ্টদ্যুম্নকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে পাণ্ডবরা এই সেনার অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নিশ্চিতভাবেই যুদ্ধের প্রধান যোদ্ধা হলেও পাঞ্চালরাই কৌরবদের প্রধান শত্রু বলে বিবেচনা করছেন। সেজন্যই সেনার কর্তৃত্ব থাকছে সোমক বংশীয়দের হাতে।
রণক্ষেত্রের দিকে তাকান, ৯ দিন প্রচণ্ড যুদ্ধের পরও অপরাজেয় ভীষ্ম প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জয় এবং পাণ্ডবদের মাঝখানে। তাঁঁকে পরাস্ত করতে অর্জুন অক্ষম। তাই শিখণ্ডীকে এসে দাঁড়াতে হয়েছে অর্জুনের বর্ম হিসেবে অথবা তাঁঁকে নিরস্ত্র করার অস্ত্র হিসেবে। যুদ্ধের পঞ্চদশতম দিনে দ্রুপদের প্রাণ হরণ করে শত্রুতার ঋণ শোধ করেছেন দ্রোণ। তারপর অশ্বত্থামার মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদে বিশ্বাস করে তিনি যখন অস্ত্র ত্যাগ করে রণক্ষেত্রের মধ্যেই ধ্যানে বসেছেন, তখন সব যুদ্ধনীতি বিসর্জন দিয়ে দ্রোণের মাথা কেটে জীবনের উদ্দেশ্য পূর্ণ করেছেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। আর তারই শেষ প্রতিশোধ সৌপ্তিক পর্বে রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র পাঞ্চাল এবং দ্রৌপদীর পাঁঁচ ছেলেকে নৃশংসভাবে খুন করে নিয়েছেন অশ্বত্থামা, যার বিবরণ প্রথমেই দেওয়া হয়েছে।
তাই আঠারো দিনের যুদ্ধ শেষে লোপ পেলো শুধু কুরুবংশই নয়, পাঞ্চাল বংশও। কুরুক্ষেত্রের ঘোর যুদ্ধফল হিসেবে মুছে গেলো দুটি চির বিবদমান প্রাচীন রাজবংশ। এই যুদ্ধ ও ভারতকাব্য তাই আসলে কুরু-পাঞ্চাল সংগ্রামের জটিল, দীর্ঘ ও সর্বধ্বংসী শোকগাথা।

No comments:
Post a Comment